
সাকিব হোসেন (পটুয়াখালী)
দক্ষিণাঞ্চলের প্রাচীন জনপদ পটুয়াখালী সদর ও দুমকি উপজেলার সীমান্তবর্তী শ্রীরামপুর গ্রামটি লুকিয়ে আছে শত শত বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য আর নানা রোমাঞ্চকর লোকগাথা। তৎকালীন চন্দ্রদীপ তথা বৃহত্তর পটুয়াখালীর এই অঞ্চলে বৌদ্ধ ও মুঘল আমলের যে কয়টি প্রাচীন নিদর্শন টিকে আছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো ঐতিহাসিক ‘শ্রীরামপুর জমিদার বাড়ি’ বা ‘মিয়া বাড়ি’। তবে দীর্ঘদিনের অযত্ন, অবহেলা এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে দৃষ্টিনন্দন প্রাচীন সেতু, শতবর্ষী মসজিদ ও জমিদার বাড়ির অবশিষ্টাংশ আজ বিলুপ্তির পথে।

ইতিহাস ও স্থানীয় প্রবীণদের সূত্রে জানা যায়, পটুয়াখালীর এই অঞ্চলে ৯০০ থেকে ১২০০ শতকের মধ্যবর্তী সময়ে প্রাচীন সভ্যতা ও সংস্কৃতির বিকাশ ঘটেছিল। পরবর্তী সময়ে মুঘল শাসনামল শেষ হওয়ার পর বাংলার নবাব মুর্শিদ কুলী খানের প্রধান খাজানচী সীবন মজুমদার ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে ‘সীবন খাঁ’ নাম ধারণ করেন এবং পটুয়াখালীর শ্রীরামপুরে প্রকাণ্ড জমিদারি গড়ে তোলেন। তাঁরই দুই উত্তরসূরি আলে খাঁ ও কালে খাঁর নামে এই জমিদার বাড়িটি পরিচিতি লাভ করে। প্রায় ৫২ কানি জমির ওপর বিস্তৃত ছিল এই বিশাল সাম্রাজ্য। কালে খাঁর অধীনে ছিল ৫৭টি মৌজা। কথিত আছে, রাজস্ব আদায়ের প্রচুর অর্থ ঘোড়ার পিঠে বয়ে এনে বাড়ির কোনো এক গোপন স্থানে মাটিচাপা দিয়ে সিলগালা করে রাখা হয়েছিল, যার সন্ধান আজও মিলেনি।

জমিদার বাড়ির মূল প্রবেশপথে একসময় আটটি সুবিশাল তোরণ বা গেট ছিল, যার কিছু চিহ্ন আজও দেখা যায়। এর সামান্য দূরেই রয়েছে একটি বিতর্কিত ‘অন্ধকূপ’ এবং তিনটি পৃথক বন্দিশালা। স্থানীয় প্রবীণদের মুখে মুখে ফেরা গল্প অনুযায়ী, প্রজারা খাজনা দিতে ব্যর্থ হলে বা জমিদারদের অবাধ্য হলে তাঁদের এসব বন্দিশালা ও অন্ধকূপে ফেলে অমানুষিক নির্যাতন চালানো হতো। বর্তমানে অন্ধকূপটি বন্ধ থাকলেও এর রোমহর্ষক ও নৃশংস ইতিহাস এলাকার মানুষের মুখে মুখে ফেস আর চারপাশের ভগ্নাবশেষ আজও সেই বিভীষিকার সাক্ষ্য দেয়।

জমিদার বাড়ির বাইরে খালের ওপর শোভা পাচ্ছে এক ঐতিহাসিক ধনুকাকৃতির আর্চ বা খিলান সেতু। আনুমানিক ১৮১০ সালে কালে খাঁর ছেলে রুম্মা খাঁ এটি নির্মাণ করেন। দৃষ্টিনন্দন ও শ্যাওলা পড়া এই প্রাচীন সেতুটি স্থানীয়ভাবে ‘কালে খাঁর ব্রিজ’ নামে পরিচিত। পটুয়াখালী জেলায় মুঘল বা উপনিবেশ আমলের মধ্যবর্তী সময়ে নির্মিত এমন ঐতিহাসিক সেতু আর দ্বিতীয়টি দেখা যায় না।
এছাড়া জমিদার বাড়ির প্রবেশপথের কাছেই রয়েছে একটি মঠের আদলে তৈরি ঐতিহ্যবাহী জোড়া কবরস্থান, যেখানে শায়িত আছেন জমিদার কালে খাঁ ও তাঁর স্ত্রী। কবরের পাশেই অবস্থান করছে ৮০০ বছরের পুরনো ঐতিহাসিক ‘কালে খাঁ জামে মসজিদ’। সীবন খাঁর আমলের এই স্থাপত্যগুলো সেকালের নির্মাণশৈলীর অনন্য নিদর্শন।

নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর কর্তৃক মসজিদ, জোড়া কবর এবং প্রাচীন সেতুটির আংশিক সংস্কার করা হয়েছিল এবং সে সময় নিরাপত্তার জন্য একজন প্রহরীও নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে সেই প্রহরীরও কোনো অস্তিত্ব নেই। সবচেয়ে বড় আক্ষেপের বিষয়, পটুয়াখালীর এত বড় একটি ঐতিহাসিক নিদর্শনের আশপাশে কোনো ইতিহাস বা পরিচিতিমূলক তথ্যসংবলিত সাইনবোর্ড বা ফলক নেই। ফলে দূরদূরান্ত থেকে আসা ইতিহাসপ্রেমী ও দর্শনার্থীরা সঠিক তথ্য জানা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
জমিদার বংশের উত্তরসূরি কামরুজ্জামান টিপুসহ স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ঐতিহ্যবাহী এই প্রাচীন সেতু ও ঐতিহাসিক অবকাঠামো ধ্বংসের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর বা সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় যদি দ্রুত এগিয়ে না আসে, তবে পটুয়াখালীর প্রত্নতাত্ত্বিক মানচিত্র থেকে এই মূল্যবান ইতিহাস চিরতরে মুছে যাবে। অবিলম্বে পুরো এলাকাটি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান হিসেবে সংরক্ষিত ঘোষণা করা, জঙ্গল ও শ্যাওলা পরিষ্কার করে প্রাচীন সেতু ও জমিদার বাড়িটি সংস্কার করা এবং দর্শনার্থীদের সুবিধার্থে সঠিক তথ্যফলক স্থাপন করার জোরালো দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।