
সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম) সংবাদদাতা
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার কুমিরা রেলস্টেশনের পাশের দুর্গম পাহাড়ের চূড়ায় নীরবে দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাসের এক বিস্মৃত অধ্যায়। ব্রিটিশ পরিকল্পনা ও প্রকৌশলগত সহযোগিতায় নির্মিত পুরাতন বক্ষব্যাধি হাসপাতাল (টিবি হাসপাতাল) ও স্যানেটোরিয়াম—যা একসময় যক্ষা রোগীদের চিকিৎসা ও সুস্থতার আশ্রয়স্থল ছিল, আজ তা পরিণত হয়েছে পরিত্যক্ত ধ্বংসস্তূপে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বর্তমানে এটি জুয়ারি, মাদকসেবী ও অসামাজিক কর্মকাণ্ডের নিরাপদ আস্তানায় রূপ নিয়েছে।
জানা যায়, তৎকালীন আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের যক্ষা রোগের চিকিৎসার জন্য মনোরম ও দূষণমুক্ত পাহাড়ি পরিবেশে এই হাসপাতালটি নির্মাণ করা হয়। যক্ষা রোগীদের জন্য নির্মল বাতাস ও প্রাকৃতিক পরিবেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় কুমিরা পাহাড়ের চূড়াকেই হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যনিবাসের জন্য উপযুক্ত স্থান হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছিল।
প্রায় ৩৯ একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত এই হাসপাতাল কমপ্লেক্সে ছিল তিনটি প্রধান দ্বিতল ভবন, চিকিৎসা কক্ষ এবং ডাক্তারদের আবাসিক ব্যবস্থা। যদিও ব্রিটিশ আমলে এর নির্মাণ কাজ শুরু হয়, হাসপাতালটির কার্যক্রম মূলত ১৯৫৫ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয়। পরবর্তীতে দেশে যক্ষার প্রকোপ কমে গেলে ১৯৯২ সালে হাসপাতালের সকল সরঞ্জাম ও কার্যক্রম চট্টগ্রাম সিআরবি রেলওয়ে হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। এরপর থেকেই হাসপাতালটি কার্যত পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে।
দীর্ঘদিন রক্ষণাবেক্ষণের অভাব ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে এখন পুরো এলাকাটি জঙ্গল, লতাপাতা ও আগাছায় ঢেকে গেছে। ভবনের ছাদ, দেয়াল, মেঝে, দরজা-জানালার কপাট ধীরে ধীরে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, বছরের পর বছর ধরে ভবনের ইট, রড, কাঠ, দরজা-জানালা ও অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রী চুরি হয়ে গেছে।
এক সময়ের আধুনিক চিকিৎসাকেন্দ্র আজ পরিণত হয়েছে রহস্যঘেরা ধ্বংসস্তূপে। দুর্গম পাহাড়ি পথ, নির্জন পরিবেশ এবং কঙ্কালসার ভবনের কারণে এটি স্থানীয় তরুণ ও পর্যটকদের কাছে “হান্টেড অ্যাডভেঞ্চার প্লেস” হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। বিভিন্ন ইউটিউবার ও কনটেন্ট ক্রিয়েটর এখানে এসে ভৌতিক ও রোমাঞ্চকর ভিডিওচিত্র ধারণ করছেন।
তবে সচেতন মহলের প্রশ্ন—এমন একটি ঐতিহাসিক ও ব্রিটিশ স্থাপত্যশৈলির গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন কেন অবহেলায় ধ্বংস হবে? যথাযথ সংরক্ষণ, নিরাপত্তা ও সংস্কারের মাধ্যমে এটি একটি ঐতিহাসিক পর্যটন কেন্দ্র কিংবা হেরিটেজ স্পট হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
সীতাকুণ্ডের পাহাড়ের বুকে দাঁড়িয়ে থাকা পুরোনো এই টিবি হাসপাতাল যেন আজও ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে শ্বাস নিচ্ছে—এক বিস্মৃত স্বপ্নপুরী, হারিয়ে যাওয়া এক টুকরো সোনালী অতীতের স্মারক।