
সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধিঃ
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে ডেঙ্গু পরিস্থিতি। জেলার অন্যান্য উপজেলার তুলনায় সীতাকুণ্ডেই ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এখন পর্যন্ত উপজেলায় ৪২৭ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছেন। এরই মধ্যে মাত্র ৯ দিনের ব্যবধানে দুই শিশুসহ তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। এতে ডেঙ্গু নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ ও আতঙ্ক বাড়ছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলায় ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বাড়লেও সীতাকুণ্ডে আক্রান্তের সংখ্যা অন্য সব উপজেলাকে ছাড়িয়ে গেছে। আক্রান্তের এই সংখ্যা উপজেলাটিতে ডেঙ্গুর সংক্রমণ কতটা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে, তারই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
৯ দিনে দুই শিশুসহ ৩ মৃত্যু
সীতাকুণ্ডে ডেঙ্গু পরিস্থিতির সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো অল্প সময়ের ব্যবধানে তিনজনের মৃত্যু।
সর্বশেষ গত ১৭ সেপ্টেম্বর সকালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সিরাজুল মনিরা (৫) নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়। সে সীতাকুণ্ড পৌরসভার আমিরাবাদ এলাকার নুরুন্নবীর মেয়ে।
এর আগে ভাটিয়ারী এলাকার রাফসান নামের এক যুবক ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এছাড়া এর আগে তিন বছর বয়সী শিশু মুজাহিদ ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে চমেক হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়।
মাত্র নয় দিনের ব্যবধানে দুই শিশুসহ তিনজনের মৃত্যু হওয়ায় সীতাকুণ্ডে ডেঙ্গুর ভয়াবহতা নতুন করে সামনে এসেছে।
এক মাসে ডেঙ্গু রোগী দ্বিগুণ
ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন ফৌজদারহাটের(বিআইটিআইডি)-এর বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. মামুনুর রশীদ।
তিনি বলেন, গত এক মাসে ডেঙ্গু রোগীর পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে। থেমে থেমে বৃষ্টি হওয়ার কারণে বিভিন্ন স্থানে পানি জমে থাকছে। এসব জমে থাকা পানিতে এডিস মশার বংশবিস্তার হচ্ছে। ফলে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যাও বাড়ছে।
অধ্যাপক ডা. মামুনুর রশীদ বলেন, কারও শরীরে জ্বরের উপসর্গ দেখা দিলে বিষয়টি অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। প্রয়োজনে ডেঙ্গু পরীক্ষা করিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা নিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুধু চিকিৎসার ওপর নির্ভর করলে হবে না। বাড়িঘর ও আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখতে হবে এবং কোথাও পানি জমতে দেওয়া যাবে না। এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে ব্যক্তি পর্যায়েও সচেতনতা বাড়াতে হবে।
থেমে থেমে বৃষ্টিতে বাড়ছে ঝুঁকি
সীতাকুণ্ডের বিভিন্ন এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টির পর বাড়ির আঙিনা, ছাদ, নির্মাণাধীন ভবন, পরিত্যক্ত পাত্র, টায়ারসহ বিভিন্ন স্থানে পানি জমে থাকছে। এসব স্থানে এডিস মশা বংশবিস্তার করতে পারে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নিয়মিত মশক নিধন কার্যক্রম ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম আরও জোরদার করা প্রয়োজন। বিশেষ করে ডেঙ্গুর হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত এলাকাগুলোতে নিয়মিত অভিযান ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন তারা।
চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার আহ্বান
স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জ্বর হলেই আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই, তবে জ্বরকে অবহেলাও করা যাবে না। ডেঙ্গুর উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। বিশেষ করে জ্বরের সঙ্গে শরীর ব্যথা, মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, বমি, দুর্বলতা বা অন্য কোনো অস্বাভাবিক উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে বা চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে।
সীতাকুণ্ডে আক্রান্তের সংখ্যা ৪২৭ জনে পৌঁছানো এবং মাত্র নয় দিনে তিনজনের মৃত্যু হওয়ায় এখনই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সমন্বিতভাবে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি উঠেছে। মশক নিধন, পরিচ্ছন্নতা অভিযান, ডেঙ্গু পরীক্ষার সুযোগ বাড়ানো এবং জনসচেতনতা তৈরিতে প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগের আরও সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।