
সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধিঃ
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে রেলওয়ের সম্পত্তিতে উচ্ছেদ অভিযান স্থানীয় বাসিন্দাদের বাধার মুখে স্থগিত করা হয়েছে। উচ্ছেদ অভিযান ঠেকাতে জোড়ামতল এলাকায় কয়েকশ বাসিন্দা জড়ো হলে পরিস্থিতি বিবেচনায় অভিযান বন্ধ করে দেয় রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। পরে স্থানীয়দের সঙ্গে আলোচনা শেষে রেলওয়ের জায়গায় বসবাসকারীদের নিজ নিজ উদ্যোগে স্থাপনা সরিয়ে নিতে এক মাস সময় দেওয়া হয়েছে।
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) বেলা আনুমানিক ১১টার দিকে উপজেলার সোনাইছড়ি ইউনিয়নের জোড়ামতল এলাকায় মহাসড়কের পূর্ব পাশে কেওয়াইসিআর ইন্ডাস্ট্রির সংলগ্ন রেলওয়ের সম্পত্তিতে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করতে যায় রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। এ সময় প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ জন স্থানীয় বাসিন্দা ঘটনাস্থলে জড়ো হয়ে অভিযানে বাধা দেন।
অভিযানে নেতৃত্ব দেন বাংলাদেশ রেলওয়ে চট্টগ্রামের সিনিয়র সহকারী সচিব ও বিভাগীয় ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তা মো. খোরশেদ আলম চৌধুরী। অভিযান শুরু হলে স্থানীয় বাসিন্দাদের একটি অংশ তাকে লক্ষ্য করে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন। একপর্যায়ে পরিস্থিতি বিবেচনায় উচ্ছেদ কার্যক্রম স্থগিত করা হয়।
পরে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে আলোচনা করেন। আলোচনায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃবৃন্দসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন। আলোচনা শেষে রেলওয়ের সম্পত্তিতে বসবাসকারীদের নিজ নিজ উদ্যোগে স্থাপনা সরিয়ে নিতে আগামী এক মাস সময় দেওয়া হয়।
৩০ বছর ধরে বসবাস, উচ্ছেদ আতঙ্কে শত শত পরিবার
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, রেলওয়ের ওই জায়গায় প্রায় ৩০ বছর ধরে কয়েকশ পরিবার বসবাস করে আসছে। দীর্ঘদিন ধরে এখানে বসবাস করায় অনেক পরিবারের জীবিকা, সন্তানদের পড়াশোনা এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রা এই এলাকার সঙ্গে জড়িয়ে গেছে।
তাদের অধিকাংশই নিম্নআয়ের ও দিনমজুর শ্রেণির মানুষ। কেউ নির্মাণশ্রমিক, কেউ রিকশা-ভ্যানচালক, আবার কেউ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে কাজ করেন। দিন এনে দিন খেয়ে সংসার চালানো এসব পরিবারের অনেকেরই নিজস্ব জমি বা অন্যত্র যাওয়ার মতো আর্থিক সামর্থ্য নেই।
স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, “আমরা প্রায় ৩০ বছর ধরে এখানে বসবাস করছি। এই জায়গা ছাড়া আমাদের যাওয়ার মতো আর কোনো জায়গা নেই। ঘরবাড়ি উচ্ছেদ করা হলে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে কোথায় থাকব, সেটাই আমাদের সবচেয়ে বড় চিন্তা।”
আরেক দিনমজুর বলেন, “আমরা দিন এনে দিন খাই। কোনো দিন কাজ পাই, কোনো দিন পাই না। অনেক কষ্ট করে এই ছোট ঘরটি করেছি। ঘরটি ভেঙে দিলে নতুন করে ঘর করার সামর্থ্য আমাদের নেই।”
পুনর্বাসনের দাবি
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, রেলওয়ের সম্পত্তি প্রয়োজন হলে কর্তৃপক্ষ আইন অনুযায়ী জায়গাটি উদ্ধার করতে পারে। তবে দীর্ঘদিন ধরে বসবাসকারী নিম্নআয়ের ও অসহায় পরিবারগুলোর বিষয়টি মানবিকভাবে বিবেচনা করে উচ্ছেদের আগে পুনর্বাসন অথবা বিকল্প আবাসনের ব্যবস্থা করা হোক।
তাদের ভাষ্য, শুধু স্থাপনা সরিয়ে নেওয়ার জন্য এক মাস সময় দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। কারণ এসব পরিবারের অনেকেরই অন্য কোথাও জমি নেই। ফলে এক মাস পর ঘর সরিয়ে নিলে পরিবারগুলো কার্যত খোলা আকাশের নিচে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কেওয়াইসিকে জায়গা দেওয়ার অভিযোগ
এদিকে স্থানীয়দের একটি অংশ অভিযোগ করেছেন, রেলওয়ের ওই জায়গা নিয়ে একটি অসাধু চক্র দখলের চেষ্টা করছে। তাদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে বসবাসকারী সাধারণ মানুষকে উচ্ছেদ করে জায়গাটি স্থানীয় একটি প্রতিষ্ঠান কেওয়াইসি-কে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
তবে স্থানীয়দের এ অভিযোগের বিষয়ে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাসিন্দারা বলছেন, রেলওয়ের জায়গা নিয়ে প্রকৃত তথ্য জনগণের সামনে পরিষ্কার করা প্রয়োজন। জায়গাটি বর্তমানে কী অবস্থায় রয়েছে, কার নামে বা কী উদ্দেশ্যে ব্যবহার বা লিজ দেওয়া হয়েছে কি না—এসব বিষয় তদন্ত করে দেখার দাবি জানিয়েছেন তারা।
তাদের আরও দাবি, সাধারণ মানুষকে উচ্ছেদ করে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ রক্ষা করা হচ্ছে কি না, সেটিও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের খতিয়ে দেখা উচিত।
সাংবাদিকদের প্রশ্নে বক্তব্য দেননি রেলওয়ে কর্মকর্তা
উচ্ছেদ অভিযান স্থগিত হওয়ার পর সাংবাদিকরা অভিযান পরিচালনাকারী বাংলাদেশ রেলওয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব ও বিভাগীয় ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তা মো. খোরশেদ আলম চৌধুরীর কাছে অভিযানের বিষয়ে জানতে চান। তবে তিনি সাংবাদিকদের কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি।
এক মাস পর কী হবে?
রেলওয়ের দেওয়া এক মাসের সময়ের মধ্যে বাসিন্দারা নিজ নিজ স্থাপনা সরিয়ে না নিলে পরবর্তীতে আইনানুগভাবে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হবে বলে জানা গেছে।
এদিকে এক মাসের সময় পাওয়ায় আপাতত স্বস্তি ফিরলেও উচ্ছেদের আশঙ্কা কাটেনি জোড়ামতলের বাসিন্দাদের। দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে যেখানে বসবাস, সেই ঘরবাড়ি ছেড়ে কোথায় যাবেন—এ নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন তারা।
স্থানীয়দের দাবি, রেলওয়ের সম্পত্তি উদ্ধারের পাশাপাশি মানুষের বসতবাড়ি ও জীবিকার বিষয়টিও মানবিকভাবে বিবেচনা করা হোক।
এখন জোড়ামতলের শত শত পরিবারের একটাই প্রশ্ন—
“এক মাস পর যদি ঘর ছাড়তেই হয়, তাহলে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে আমাদের মাথা গোঁজার ঠাঁই হবে কোথায়?”