
ভূঞাপুর (টাঙ্গাইল) সংবাদদাতাঃ
স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তর ইউনিয়ন পরিষদ। জনগণের প্রত্যাশা থাকে এখানে দলমত নির্বিশেষে সবার অংশগ্রহণ ও স্বচ্ছ প্রশাসন। কিন্তু বাস্তবে অনেক জায়গায় সেই চিত্র ভিন্ন। অভিযোগ উঠেছে, সরকার পরিবর্তনের পরও সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের বিভিন্ন কার্যক্রম এখনো আওয়ামী লীগের দোসর হিসেবে পরিচিত ব্যক্তিদের নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ইউনিয়ন পরিষদের বিভিন্ন উপকমিটি গঠন, উন্নয়ন প্রকল্প বাছাই, কর্মসূচি বাস্তবায়নসহ নানা সিদ্ধান্তে প্যানেল চেয়ারম্যান মো: সাঈদ তালুকদার স্বপন নির্দিষ্ট একটি বলয়ের লোকজনকে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করানো হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে অন্য রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষ কিংবা সাধারণ নাগরিকরা নিজেদের বঞ্চিত মনে করছেন।
অভিযোগ রয়েছে, পরিষদের কিছু কার্যক্রমে এমন ব্যক্তিদেরও সম্পৃক্ত করা হয়েছে, যারা অতীতে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন। ফলে ইউনিয়ন পরিষদকে কেন্দ্র করে স্থানীয় রাজনীতিতে নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছে। বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও স্থানীয় আড্ডা-মহলেও চলছে নানা আলোচনা-সমালোচনা।
তার মধ্যে ফলদা ইউনিয়ন পরিষদে বর্তমানে যারা পরিষদ সদস্য রয়েছেন তারা সকলেই বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় নির্বাচিত সদস্য। তাদের দ্বারাই ইউনিয়ন পরিষদের সকল কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। প্রশাসনিক ও উন্নয়নমূলক সিদ্ধান্তেও তাদের প্রভাব রয়েছে বলে দাবি এলাকাবাসীর। এতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
ফলদা ইউনিয়ন পরিষদের উন্নয়নমূলক কাজে কাবিখা-কাবিটা,টিআর, জি্আর , এলজিএসপি, এলজিডি, পিআইও অফিসের কাজসহ যে সমস্ত উন্নয়ন কাজে বরাদ্দ পান প্যানেল চেয়ারম্যান আবু সাইদ তালুকদার স্বপন নিজে এবং তার অনুগত মেম্বার দিয়ে কাজ করিয়ে নেয়। সে কাজের মান নিয়ে এবং আর্থীক অনিয়ম নিয়ে নানা সময় বিভিন্ন অভিযোগ উঠে। প্যানেল চেয়ারম্যান আবু সাইদ তালুকদার স্বপন এর বিরোদ্ধে নানা অনিয়মের অভিযোগ তুলে বিগত সময়ে তার বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব এনে প্রশাসনের নিকট লিখিত অভিযোগ দেন তারই পরিষদের ৭জন সদস্য।
তার পরেও তিনি থেমে থাকেননি দুর্নীতি- অনিয়ম থেকে। তিনি ভিজিডি কার্ডের টাকা ব্যাংক একাউন্টে সঞ্চয়ী হিসেবে,জন প্রতি ২শত টাকা করে জমা না দিয়ে নিজের কাছে রেখে দেন। পরে প্যানেল চেয়ারম্যান আবু সাইদ তালুকদার স্বপনের ভিজিডি কার্ডের টাকা আত্বস্বাদ শিরোনামে সংবাদ পত্রে সংবাদ প্রকাশিত হলে, তিনি টাকা ফিরত দিতে বাধ্য হন।
ফলদা ইউনিয়ন পরিষদের অনেক গ্রামে মানুষের চলাচলের জন্য রাস্তা-ঘাটে ন্যুন্নতম সুবিধা না থাকলেও আওয়ামীলীগের প্রভাবশালী ব্যাক্তি পরিষদ সদস্য হারুন মেম্বারকে দিয়ে ব্যাক্তি স্বার্থে অন্যের বাহির বাড়ী উপর দিয়ে প্রায় ১লক্ষ ৫০ হাজার টাকা রাস্তার কাজ করার ওয়াকৃ অর্ডার পায় হারুন মেম্বার। মানুষের বাহির বাড়ির ওপর দিয়ে কাজ করার অনিয়মের অভিযোগ এনে উপজেলা নির্বাহী অফিসারে কাছে লিখিত অভিযোগ দেয় এলাকাবাসী। তার পরেও এক অদৃশ্য হাতের ছোঁয়ার মানুষের বাহির বাড়ি উপর দিয়েই কাজটি শেষ করা পায়তারা করছে পরিষদের মেম্বার হারুন ও চেয়ারম্যান স্বপন।
আরো জানা যায় ফলদা ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য ১ নং ওয়ার্ড মো: চাঁন মিয়া, ২নং মো: স্বপন তালুকদার, ৩নং মো: আক্তার হোসেন, ৪নং মো: হারুন অর রশিদ, ৫নং মো: নজরুল ইসলাম, ৬নং মো: লিটন মিয়া, ৭নং রেজাউল করিম (রাজ্জাক), ৮নং মো: মজনু তরফদার ,৯নং মো: খায়রুল ইসলাম এবং ৩জন সংরক্ষিত মহিলা সদস্য সকলই আওয়ামীলীগ রাজনৈতিক দলের সাথে জড়িত। বিগত সরকারে আমলে মো: হারুন অর রশিদ, মো” খায়রুল ইসলাম ও রেজাউল করিম ওরফে আব্দুর রাজ্জাক এদের দ্বারা এলাকাবাসী ও বিএনপির লোকজন নির্যাতিত হয়েছে এমন অভিযোগের শেষ নেই। স্থানী নির্বাচন-জাতীয় নির্বাচনে বিগত ১৭ বছর কেন্দ্রগুলো দখল করে জাল ভোট প্রদানে তারা ছিল সিদ্ধ হস্ত। তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি শত অভিযোগ থাকলেও কেউ কোন কথা বলার সাহস পেতন না। আজ তাদের দ্বারাই ফলদা ইউনিয়ন পরিষদ পরিচালিত হচ্ছে এমনটি মনে করে ইউনিয়নের জন সাধারণ। হত দরিদ্র মানুষের মাঝে বিতরণকৃত ভিজিএফ , ভিজিডি,টিসিবি,বয়স্কভাতা, বিধবা ভাতা, গর্ভবতি ভাতা বিতরণের অনিয়মের অভিযোগের শেষ নেই তাদের বিরুদ্ধে। এখানেই শেষ নয় জন্ম নিবন্ধ, মৃত্যু সনদ, বিষয়গুলোতে নির্ধারিত ফির চাইতেও বেশি ফি নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে এই পরিষদের বিরুদ্ধে।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, সরকার পরিবর্তন হলেও বাস্তবে ইউনিয়ন পরিষদের কার্যক্রমে পুরোনো রাজনৈতিক বলয়ের প্রভাব এখনো কাটেনি। ফলে সাধারণ মানুষ প্রত্যাশিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো দলীয় প্রভাবমুক্ত না হলে প্রকৃত অর্থে গণতান্ত্রিক চর্চা বাধাগ্রস্ত হয়। ইউনিয়ন পরিষদ জনগণের প্রতিষ্ঠান হওয়ায় এখানে রাজনৈতিক ভারসাম্য ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি মনে করেন ভূক্তভোগিরা।
কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ইউনিয়ন পরিষদের অনেক কার্যক্রমে আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ব্যক্তিদেরই অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। সরকার পরিবর্তনের পর আমরা ভেবেছিলাম পরিষদের কার্যক্রমে নতুন স্বচ্ছতা আসবে। কিন্তু এখনো আগের লোকজনই নানা কাজে প্রভাব খাটাচ্ছেন।
পরিষদের মেম্বার মো: মজনু বিস্তর অভিযোগ আনেন প্যানেল চেয়ারম্যান আবু সাঈদ তালুকদার স্বপনের বিরুদ্ধে । এলজিডি,কাবিটা,কাবিখা রাস্তা-ঘাটের উন্নয়ন কাজের নামে ১ বছরে কোটির টাকা মত মারছে। আমার ওয়ার্ডের (৮নং) রাস্তার আরসিসি দ্বারা পাকা করণের ( সম্ভবত ৬৬ লক্ষ টাকা) কাজ অন্য লোক দিয়ে করাইতেছে।নিয়ম অনুসারে ওয়ার্ডের মেম্বার সভাপতি হওয়ার কথা থাকলেও আমাকে জানানোই হয়নি, অভিযোগ ঐ মেম্বারের। বাবলু চৌকিদারকে দিয়া ভিজিএফ-এর চাউলও বিক্রি করায় এরকম অভিযোগও করেন তিনি।
ফলদা ইউনিয়ন পরিষদের দূর্নীতির অভিযোগের আরো সত্যতা মিলে, জোসনার ভিজিডি কার্ডের চাউল খায় হনুফা, প্র'তিবাদ করতে গেলে মা'ইর খায় জোসনা- এমন সংবাদ ফেইসবুকে ভাইরাল হওয়ার পর। ফলদা ইউনিয়নের ধুবলিয়া গ্রামের এ ঘটনা ফেইসবুকে প্রকাশের পর কয়েক জনকে কমান্ড করতে দেখা যায়, এ রকম একজনের কার্ডে অন্য জন চাউল খায় আরো অনেক আছে।
তবে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান সাঈদ তালুকদার স্বপন অভিযোগ অস্বীকার করে ইউনিয়ন বিএনপি নেতাদের উপর অধিকাংশ কাজের ভাগ-বন্টনের দায় চাপিয়ে দেন। আবার এ কথাও বলেন তিনি পরিষদের সকল কার্যক্রম সরকারি নীতিমালা মেনেই পরিচালিত হচ্ছে বলে জানান। এখানে কোনো ধরনের অনিয়ম নেই বলে তার দাবি।
এদিকে স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, ইউনিয়ন পরিষদের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের আরও সক্রিয় নজরদারি প্রয়োজন। তা না হলে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। যারা পরিষদের কার্যক্রমের সাথে যুক্ত তাদের অনেকেই প্রকাশ্যে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। এতে সাধারণ মানুষ মনে করছে, পরিষদের ভেতরে এখনোও সেই দোসরদের প্রভাবই কাজ করছে ।