
বাগেরহাট শরনখোলা সংবাদদাতা
বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলায় নিজ বসতঘর থেকে স্বামী-স্ত্রীর মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। মৃতদেহের পাশ থেকে মানসিক চাপ ও যন্ত্রণার কথা উল্লেখ করা একটি চিরকুট পাওয়া গেছে। তবে নিহত স্ত্রীর গলায় আঘাতের চিহ্ন থাকায় এটি নিছকই আত্মহত্যা, নাকি স্ত্রীকে হত্যার পর স্বামীর আত্মহত্যা—তা নিয়ে ব্যাপক রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) সকালে উপজেলার খোন্তাকাটা ইউনিয়নের পূর্ব রাজৈর গ্রাম থেকে মরদেহ দুটি উদ্ধার করা হয়। বাবা-মায়ের নিথর দেহের পাশে পড়ে থাকা দুই মাস বয়সী এক অবুঝ শিশুর কান্নায় ওই এলাকায় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়।
নিহতরা হলেন—পূর্ব রাজৈর গ্রামের আব্দুল মজিদ হাওলাদারের ছেলে কবির হাওলাদার (৩২) এবং তাঁর স্ত্রী হালিমা বেগম (২৬)। পেশায় জেলে কবির সাগরে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতেন। এই দম্পতির সংসারে একটি শিশুকন্যা ও মাত্র দুই মাস বয়সী একটি ছেলে সন্তান রয়েছে।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার সকালে কবিরের ঘর থেকে শিশুদের একটানা কান্নাকাটির আওয়াজ শুনতে পান প্রতিবেশীরা। ডাকাডাকি করেও ভেতর থেকে কবির বা হালিমার কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে সন্দেহ হলে জানালা দিয়ে স্বামী-স্ত্রীর নিথর দেহ বিছানায় পড়ে থাকতে দেখেন তারা। খবর পেয়ে স্থানীয়রা ঘরের দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন এবং মৃতদেহের পাশে দুই মাসের শিশুটিকে কান্নারত অবস্থায় দেখতে পান। পরে পুলিশে খবর দিলে তারা এসে মরদেহ উদ্ধার করে।
পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে কবিরের স্বাক্ষর করা একটি হাতে লেখা চিরকুট উদ্ধার করেছে। সেখানে লেখা রয়েছে—
"মানসিক যন্ত্রণা এবং প্রেসার আর নিতে পারছি না। তাই আমরা এমন কোথাও চলে যাচ্ছি আর ফিরে আসবো না। সবাই শান্তিতে থাকুক। আমাদের মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়। ইতি, কবির।"
এলাকাবাসী জানান, অভাব-অনটনের কারণে কবির ও হালিমা দম্পতির সংসারে প্রায়ই কলহ লেগে থাকত। এর পাশাপাশি কবিরের ওপর ঋণের বোঝাও ছিল। নিহত কবিরের বাবা আব্দুল মজিদ হাওলাদার বলেন, "ছেলে ও পুত্রবধূর মধ্যে প্রায়ই পারিবারিক বিষয় নিয়ে ঝগড়া হতো। সকালে কোনো সাড়া না পেয়ে ঘরে গিয়ে দুজনকে মৃত অবস্থায় দেখতে পাই।"
অন্যদিকে, নিহত হালিমা বেগমের বাবা মোহাম্মদ বাবুল হাওলাদার বলেন, "কীভাবে এ ঘটনা ঘটেছে তা আমরা নিশ্চিত নই। আমরা সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত রহস্য উদঘাটনের দাবি জানাই।"
শরণখোলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রোকেয়া খানম জানান, মৃতদেহ দুটি সুরতহাল শেষে ময়নাতদন্তের জন্য বাগেরহাট জেলা সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে।
তিনি বলেন, "প্রাথমিকভাবে বিষপানে আত্মহত্যার কথা বলা হলেও, নিহত হালিমা বেগমের গলায় আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, পারিবারিক কলহের জেরে স্ত্রীকে হত্যার পর স্বামী আত্মহত্যা করে থাকতে পারেন। এছাড়া ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া চিরকুটটি সত্যিই তাদের লেখা কি না, তা নিশ্চিত হতে অধিকতর তদন্তের জন্য সেটি ফরেনসিক ল্যাবে পাঠানো হবে।"
এ ঘটনায় থানায় আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। ময়নাতদন্ত ও ফরেনসিক প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পরই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে জানিয়েছে পুলিশ। মাত্র দুই মাস ও কয়েক বছর বয়সী দুটি ফুটফুটে সন্তানকে এতিম করে বাবা-মায়ের এমন মর্মান্তিক মৃত্যুতে পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।