
চুয়াডাঙ্গা সংবাদদাতাঃ
চুয়াডাঙ্গা শহরের শেখপাড়ায় ঝুলন্ত অবস্থায় উদ্ধার হওয়া তরুণী মুমতাহেনা অহনার (২২) মরদেহের পাশ থেকে উদ্ধার হওয়া চিরকুটে উল্লেখিত প্রেমিক শ্রাবণ রহমান জিতুর পরিচয় মিলেছে। তিনি নিজেই দেওয়া বক্তব্যে তাদের সম্পর্ক, বিচ্ছেদ এবং সর্বশেষ যোগাযোগের বিস্তারিত তুলে ধরেছেন।
শ্রাবণ রহমান জিতু মুঠোফোনে বলেন, প্রায় পাঁচ মাস আগে চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজ এলাকায় তাদের পরিচয় হয়। সেখান থেকেই সম্পর্কের সূচনা। তিনি বলেন, “দীর্ঘ পাঁচ মাস আমাদের মধ্যে সম্পর্ক ছিল। তবে সম্প্রতি জানতে পারি, অহনা ধূমপানসহ নেশাজাতীয় দ্রব্য সেবন করতো। এছাড়া অন্যান্য কারণে ঈদুল ফিতরের দুদিন পর আমি তার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করি।”
ব্রেকআপের পর শেষ দেখা সম্পর্কে তিনি বলেন, “প্রায় ১৫ দিন আগে সরকারি কলেজের সামনে দেখা হয়েছিল। সে সম্পর্কের কারণ জানতে চেয়েছিল, কিন্তু আমি তাকে ফিরিয়ে দিই। এরপর আর কোনো যোগাযোগ হয়নি।”তিনি আরও বলেন, “সে যে এমন সিদ্ধান্ত নেবে, তা আমি কখনো ভাবিনি। এই কাজটি সে ঠিক করেনি।”চিরকুটে সংসারের কথা উল্লেখ করার বিষয়টি জানতে চাইলে জিতু বলেন, আমাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক ছিল। এ জন্য সে মনে করেছিল এটা সংসারের মত। এ জন্য লিখতে পারে। তবে আমরা বিবাহ করিনি।
জানা গেছে, শ্রাবণ রহমান জিতু আলমডাঙ্গা উপজেলার চিৎলা ইউনিয়নের কয়রাডাঙ্গা গ্রামের বাসিন্দা এবং দর্শনা সরকারি কলেজের অনার্স প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী।
এর আগে বুধবার (২৯ এপ্রিল) বেলা সাড়ে ৩টার দিকে চুয়াডাঙ্গা শহরের শেখপাড়ার একটি ভাড়া বাসা থেকে মুমতাহেনা অহনার ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তিনি ওই বাসায় একাই বসবাস করতেন। নিহত অহনা গোপালগঞ্জ জেলা সদরের বাসিন্দা এবং চুয়াডাঙ্গা সমবায় নিউ মার্কেট এলাকার ‘রংধনু গিফট গার্ডেন’-এ ব্র্যান্ড প্রমোটার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া চিরকুটে আবেগঘন ভাষায় প্রেমিকের প্রতি ভালোবাসা, সম্পর্ক ভাঙার কষ্ট এবং ব্যক্তিগত জীবনের হতাশা ফুটে উঠেছে।
চিরকুটে যা লেখা আছে, পাঠকদের নিকট হুবহু তুলে ধরা হলো- শ্রাবণ রহমান জিতু আমি তোমাকে অসম্ভব ভাবে ভালোবাসতাম আমি। আমার ভয়াবহ অতীত নিয়েও সত্যিকারের ভালোবাসছিলাম। তোমাকে নিয়ে অনেক সপ্ন দেখেছিলাম। আমাদের ছোটো একটা সংসার হবে, আমাদের একটা সুন্দর একটা ভবিষ্যৎ হবে। কিভাবে পারলে ? একটিবার ও আমার কথা মনে পড়লো না? আমাদের মূহূর্তগুলো কোনোকিছুই মনে পড়লো না? আমরা ঝগড়া করতাম, মারামারি করতাম তবুও একসময় ভালোবাসতে ছাড়িনি। শ্রাবন রহমান জিতু আমি তোমাকে ভালোবেসেছি। তুমিই শেষ ভালোবাসা মা-ভাই তোমরা চেষ্টা করেছে। সবসময় আগলিয়ে রাখতে কিছু কথা যার জন্য তোমাদের ক্ষতি চাই কিন্তু তোমরা আমাকে মাফ করে দিও। শ্রাবন রহমান জিতু ই আমার শেষ ভালোবাসা। এর সাথে কাটানো দিনগুলো – রাতগুলো আমার জন্য অনেক কিছু ছিল। ১ মাস একসাথে সংসার এর মত জিবনটা উপভোগ করতাম এখন সে অন্য কারো। আমার মিত্যুর দায় শুধু মাত্র শ্রাবণ রহমান জিতু পিতাঃ- মতিউর রহমানের পুত্র, আজ থেকে তুমি মুক্তি শ্রাবন রহমান জিতু মিত্যুর পর ও ভালোবাসব। আমার সাথে যা করল সেটা অন্যায়। অহনা… ২৯,০৪,২০২৬
চুয়াডাঙ্গা সদর থানার পরিদর্শক (ওসি) মিজানুর রহমান বলেন, “প্রাথমিকভাবে এটি আত্মহত্যা বলেই ধারণা করা হচ্ছে। ঘটনাস্থল থেকে একটি চিরকুট উদ্ধার করা হয়েছে, যেখানে এক ব্যক্তির প্রতি গভীর ভালোবাসার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তবে সেটি কাকে উদ্দেশ্য করে লেখা, তা নিশ্চিত হতে তদন্ত চলছে।”
তিনি আরও জানান, নিহতের মা চুয়াডাঙ্গার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন। পরিবারের সদস্যরা এলে ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে সহায়ক হবে।
রংধনু গিফট গার্ডেনের স্বত্বাধিকারী মিজানুর রহমান জুয়েল বলেন, “অহনা টেকনো এন্টারপ্রাইজের অধীনে ব্র্যান্ড প্রমোটার হিসেবে কাজ করতেন। প্রায় এক বছর ধরে তিনি আমার দোকানে কর্মরত ছিলেন। বুধবার সকালে দোকানে না আসায় ফোন করেও কোনো সাড়া পাইনি। পরে জানতে পারি তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।”তিনি আরও জানান, অহনা সম্প্রতি শেখপাড়ায় নতুন ভাড়া বাসায় উঠেছিলেন এবং ব্যক্তিগত জীবনে ডিভোর্সি ছিলেন। পারিবারিক কারণেও এ ঘটনা ঘটতে পারে বলে ধারণা করছেন তিনি।
বাড়ির মালিক জানান, “১০-১২ দিন আগে তিনি এই বাসা ভাড়া নেন। একটি শিশু প্রথমে জানালা দিয়ে তাকে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখে আমাদের জানায়। পরে নিশ্চিত হয়ে পুলিশে খবর দিলে তারা এসে মরদেহ উদ্ধার করে।”
পুলিশ জানিয়েছে, এ ঘটনায় আইনগত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে