
চুয়াডাঙ্গা সংবাদদাতা
শুরু হয়েছে বর্ষা মৌসুম। আর বর্ষা মৌসুমকে সামনে রেখে চুয়াডাঙ্গায় মাছ ধরার বিত্তি ও জাল- মাছ ধরার উপকরন বিক্রি ধুম পড়েছে। গত কয়েক বছরের তুলনায় চুয়াডাঙ্গায় প্রচুর পরিমাণে বৃষ্টিপাত হচ্ছে। শ্রাবণ মাসের শুরু হওয়ার আগে থেকে প্রতিদিন কখনো হালকা, মাঝারি আবার কখনো মুষলধারে বৃষ্টিপাত হচ্ছে। বৃষ্টির পানিতে ভরে গেছে জেলার ৪ উপজেলার খাল-বিল, নদী, পুকুর, বাওড়, ডোবা,
মাঠ পানিতে থৈথৈ করেছে। বিশেষ করে গ্রাম-গঞ্জের বিল অঞ্চলগুলোতে বৃষ্টির নতুন পানিতে উঠে আসছে দেশি প্রজাতির কাটরা মাছ। পুঁটি, চিংড়ি, টাকি, ঝাঁয়া, টেংরা, শিং মাছ, পাকাল তোরা, বাইনসহ দেশীয় বিভিন্ন প্রজাতির ছোট মাছ ,ধরার উপকরন বিক্রি ধুম পড়ে যায়। বিশেষ করে গ্রামীণ জীবনে বর্ষায় দলবদ্ধভাবে মাছ শিকার উৎসবে পরিণত হয়।
এতে শিকারীদের মনে আনন্দের বন্য বয়ে যায়। আবার অনেকের পুকুর বা মাছের ঘের প্লাবিত হয়ে মাছ চলে আসে খালে বা বিলের পানিতে। তাই বর্ষার এ সময়টাতে জেলায় মাছ ধরার উপকরেন কদর বেড়ে যায়। গ্রামের ঘরে ঘরে বিত্তি জাল প্রস্তুুত রাখে সবাই। আবার অনেকেই নতুন বিত্তি, জাল কিনে রাখে মাছ শিকারের জন্য। যুবকরা দল বেধে মাছ শিকারে যায়। এক ধরনের উৎসবে মেতে উঠে গ্রাম গঞ্জের মানুষ।
সেই কারণে চাহিদা বেড়েছে বিত্তির। এই ছোট মাছ ধরার উপকরণ বিত্তি বা ঘূর্ণি তৈরির কাজের ব্যস্ততা বেড়েছে।দামুহুদা উপজেলার দর্শনীয় পৌরসভার রামনগর কালিদাসপাড়ায় প্রতিটি বিত্তি বাজারে বিক্রি হয় ৫০০-৬০০ টাকা দরে। বাজারে এর চাহিদা রয়েছে ব্যাপক। কারণ এখানকার তৈরি বিত্তির মান ভালো।
জেলায় প্রায় ২০০ পরিবার বর্ষা মৌসুমে মাছ ধরার বিত্তি তৈরির কাজ করেন। বিত্তি তৈরির কাজ করে পরিবারগুলো আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হয়েছেন। এবার বর্ষায় বৃষ্টিপাত বেশি তাই বিত্তির চাহিদা বেশি। সবাই পাল্লা দিয়ে বিত্তি বুননের কাজ করে যাচ্ছে। মাছ ধরার বিত্তি তৈরির প্রধান উপকরণ বাঁশ, কারিগররা গ্রামে ঘুরে গৃহস্থের বাঁশ বাগান থেকে ২০০-২৫০ টাকা দামে বাঁশ কেনেন তারা। ভালো একটি বাঁশ থেকে ৫-৬টি বিত্তি তৈরি হয়। আর বড় মাপের বিত্তি হয় ৪টি। বাঁশ থেকে চিকন চিকন কাঠি তৈরি করতে হয় প্রথমে। তাল গাছের ডাল কেটে নিয়ে বাড়ির চৌবাচ্চাতে কয়েক দিন ভিজিয়ে নিতে হয়। পচানো ডাল কাঠের হাতুড়ি দিয়ে থ্যাঁতলে চিকন আঁশ বের করা হয়। বাঁশের কাঁটি, তালের সুতা ও নাইলনের সুতা দিয়ে গ্রামের নারী-পুরুষ নিপুণ হাতে বিত্তি তৈরি করেন। ভোর থেকে শুরু করে রাত পর্যন্ত কাজ চলে গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে।
বিত্তি তৈরির কারিগররা জানান,শুধু বর্ষাকালে এই কাজ বেশি হয়। বছরের বাকি সময় আমাদের বসে থাকতে হয়। এবার বৃষ্টিপাত বেশি তাই আমাদের কাজকর্ম বেশি। কিন্তু প্রতিবছরই এমন বর্ষা হয় না। সরকারি অথবা বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা থেকে আমাদেরকে বিত্তি তৈরির কাজে ব্যবহৃত হাতুড়ি, করাত, সুতালি ইত্যাদি বিতরণ করলে আমাদের একটু সুবিধা হয়। এ শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে সরকারি সহায়তার দাবি করেন তারা।
চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা ডুগডুগি পশু হাটে সরেজমিনে দেখা গেছে, জেলার বিভিন্ন গ্রাম থেকে আসা লোকজন তাদের পছন্দ মতো বিত্তি দরদাম করে কিনছেন।জেলার ৪টি উপজেলায় প্রায় ২০০ পরিবারের নারী পুরুষ ছোট মাছ ধরার এ ফাঁদ তৈরি করে জীবন-যাপন করেন, যা স্থানীয় ভাষায় বিত্তি । ওই বিত্তি ছোট-বড় আকার ভেদে বিক্রি হচ্ছে ৪৫০ টাকা থেকে ৬০০ টাকা দামে।
দামুড়হুদা ডুগডুগি পশুহাট, জীবননগরের শিয়ালমারি পশুহাটে পাইকারি ও খুচরা ক্রয়-বিক্রয় হয় বিত্তি। শিয়ালমারি পশুহাটের বিত্তি ব্যবসায়ী নাসের আলী জানান, তাদের দাদার আমল থেকেই তারা এ কাজের সঙ্গে জড়িত। অনেকে নতুন করে আসছে এ পেশায় তাই দিন দিন এর সঙ্গে মানুষের সম্পৃক্ততা বাড়ছেই।
বিত্তি ক্রেতা ফারুক হোসেন জানান, এ বছর আগাম বৃষ্টিতে বিলে পানি কানায় কানায় ভরা। প্রতিদিন নতুন নতুন এলাকাসহ বিলের মাঠ ডুবে যাচ্ছে। সেই ক্ষেতে কাজ নেই, তাতে কী? জীবনযুদ্ধে খেটে খাওয়া মানুষগুলো হারতে নারাজ। তাই বর্ষাও পানিতে মাছ ধরার জন্য বিত্তি ক্রয় করছে অনেকেই। তারা বিত্তি দিয়ে মাছ ধরে বাজারে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করে।
বিত্তি ক্রেতা আনিসুর রহমান বলেন, বিশেষ করে গ্রাম-গঞ্জের বিল অঞ্চলগুলোতে পানি জমে থাকে দীর্ঘদিন। আর বর্ষার নতুন পানিতে দেশীয় নানা প্রজাতীর মাছের বিচরণ বৃদ্ধি পায় সহজে। টানা বর্ষনের পানিতে নদী-খাল-বিল একাকার হয়ে যায়। মূলত নদ-নদীর বিভিন্ন মাছ এসময় ধরা পড়ে শিকারীদের বিত্তি ও জালে।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোঃ ফরহাদুর রেজা বলেন, এবার অনেক বেশি বৃষ্টি হচ্ছে। এ কারণে খাল, বিল ও ডোবায় মাছ পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে ছোট মাছ ধরতে প্রয়োজন হয় বিত্তির। স্থানীয়ভাবে এটা তৈরি হচ্ছে। জেলায় বর্তমানে বিত্তির চাহিদা বেড়েছে। বৃষ্টির কারণে বৃত্তি তৈরির কারিগরদের চাহিদা বেড়েছে। বৃষ্টির সঙ্গে এ শিল্পটা জড়িত।