
কুষ্টিয়া সংবাদদাতাঃ
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগে ‘ম্যানার শেখানোর’ নামে নবীন শিক্ষার্থীদের ওপর মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। মুখে ময়লা পানি দিয়ে মুখ বন্ধ রাখা, ১০ রকম হাসি, ল্যাম্পপোস্ট গণনা, ১০ তলা ভবনের ছাদে উঠিয়ে ছবি-ভিডিও ধারণসহ ধর্ষণের হুমকির অভিযোগও করেছেন ভুক্তভোগীরা। ঘটনায় প্রায় ১৬ জন শিক্ষার্থী বিভাগীয় শিক্ষকদের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ অনুযায়ী, নবীন শিক্ষার্থীদের মুখে ময়লা পানি নিয়ে মুখ বন্ধ রেখে অপরজনকে ১০ রকম হাসি দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়। স্থাপনার নাম ভুল করায় নবনির্মিত ১০ তলা ভবনের ছাদে উঠিয়ে ছবি ও ভিডিও ধারণের নির্দেশ দেওয়া হয়। এছাড়া ক্যাম্পাসের ল্যাম্পপোস্ট গণনা, ৭০/৮০ বার কাগজ ও পানির বোতলের উদ্দেশ্যে পরিচয় দেওয়া, ওরিয়েন্টেশনের দিন সিটবিহীন ফাঁকা কক্ষে তিন থেকে চার ঘণ্টা আটকে রাখার অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়, পরবর্তীতে ক্যাম্পাসে বিভিন্ন সময় অশ্লীল বাক্য বলতে বাধ্য করে ভিডিও ধারণ ও তা বিভাগের কমন গ্রুপে শেয়ারের নির্দেশ, জোর করে নাচানো হয়। এক নবীন নারী শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের হুমকি দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
জানা যায়, এসব ঘটনায় অভিযুক্ত ২০২৪-২৫ বর্ষের সানি নেহালী, সানাউল করিম, মেহেদী হাসান, রিয়াদ হাসান ও সজীব সবচেয়ে বেশি সক্রিয় ছিলেন। এছাড়া একই বর্ষের প্রীতম, হাসিব, সারা, নির্ঝরা ও ফাইজার উপস্থিত থাকার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ না দিতে ছাত্রদল পরিচয়ে চাপ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ২০২১-২২ বর্ষের শিক্ষার্থী আমীরুল অনির বিরুদ্ধে।
ভুক্তভোগীরা জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর থেকে তাদের নিয়মিত ডাকা হতো। ক্লাস শেষে তিন থেকে চার ঘণ্টা, রাত সাড়ে ৮টা থেকে রাত ১টা পর্যন্ত বসিয়ে রাখা হতো। ক্লাস প্রতিনিধিকে প্রতিদিন বিকেল ৫টার মধ্যে সবাইকে ফুটবল মাঠে উপস্থিত করার নির্দেশ দেওয়া হতো। একদিন রাত ৮টায় জিয়া মোড়ে ডেকে লাইব্রেরির নাম ভুল বলায় ১০ মিনিটের মধ্যে লাইব্রেরির সামনে গিয়ে ছবি তুলে আনতে বলা হয়। আরও দুজনকে ডায়না চত্বরে গিয়ে ২০ মিনিটের মধ্যে ল্যাম্পপোস্ট গুনে আসার নির্দেশ দেওয়া হয়।
ক্যাম্পাসের পাশ্ববর্তী শ্রীরামপুরে নিয়ে গিয়েও আটকে রেখে মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে। এক নারী শিক্ষার্থীকে সিনিয়র ভাইয়ের সাথে দেখা করতে বলা হলে অস্বীকৃতি জানালে তাকে বলা হয়, সিনিয়ররা ডাকলে দেখা করো না, কথা শোনো না, পরে রেপ হলে কী করবা।
কুষ্টিয়া শহরে অবস্থানরত এক শিক্ষার্থীর অভিযোগ, ২০২৪-২৫ বর্ষের শিক্ষার্থী সানাউল করিম শহরে থাকা শিক্ষার্থীদের ডেকে পরিচয়পর্বের এক পর্যায়ে একজনকে ময়লা পানি মুখে নিয়ে আটকে রাখতে বলেন ও আরেকজনকে ১০ ধরনের হাসি দিতে বাধ্য করা হয়। অস্বীকৃতি জানালেও জোরপূর্বক বাধ্য করা হয়।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত সানি নেহালী বলেন, আমরা বিষয়টিকে মজা হিসেবে নিয়েছিলাম। আমি বুঝতে পারিনি বিষয়টি এত বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়াবে। তবে এখন বুঝতে পারছি, এটি ভুল হয়েছে।
এদিকে ক্যাম্পাস সংলগ্ন একাধিক ছাত্রাবাস ও মেসে নবীন শিক্ষার্থীদের ডেকে নিয়ে ছাদে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড় করিয়ে রাখা এবং জোরপূর্বক ধূমপানের পরিবেশে আটকে রাখার অভিযোগ উঠেছে। জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের ল’ অ্যান্ড ল্যান্ড অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, আইন, আল-ফিকহ অ্যান্ড ল', ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, ফার্মেসি ও লোকপ্রশাসন, বায়োমেডিকেল বিভাগেও ম্যানার শেখানোর নামে র্যাগিংয়ের ঘটনা ঘটছে।
র্যাগিংয়ের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. একেএম মতিনুর রহমান বলেন, সব অনুষদের ডিন ও বিভাগীয় প্রধানদের নোটিশ পাঠানোর আদেশ দেওয়া হয়েছে। প্রক্টরকে পুরো বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।