
শেরপুর (বগুড়া) প্রতিনিধিঃ
বগুড়ার শেরপুর উপজেলা ভূমি অফিসে গত নয় মাসে দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে। একসময় নামজারি (মিউটেশন) পেতে গড়ে ৫৩ দিন অপেক্ষা করতে হতো, এখন তা নেমে এসেছে মাত্র ১৬ দিনে। সরকারি নিয়মের ২৮ কার্যদিবসের আগেই খারিজ নিষ্পত্তি হচ্ছে। এই পরিবর্তন এসেছে সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোঃ মাহমুদুল হাসান দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে।
গত ১৬ সেপ্টেম্বর তিনি যোগদান করেন এবং ২৭ সেপ্টেম্বর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এর আগে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আশিক খান অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছিলেন। ওই সময় অফিসের কাজে ভাটা পড়ে, খাজনা-খারিজে দীর্ঘসূত্রতা দেখা দেয়, যা জমি ক্রয়-বিক্রয়েও ব্যাঘাত ঘটায়।
উপজেলা ভূমি অফিস সূত্র জানায়, চলতি অর্থবছরের ৯ মাসে (সেপ্টেম্বর-মার্চ) ১২,৫১৬টি নামজারি সম্পন্ন হয়েছে। গড় নিষ্পত্তির সময় ১৬ দিন। অথচ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পুরো বছরে নামজারি হয়েছিল ১০,০২৮টি, গড় সময় ছিল ৫৩ দিন।
খারিজ প্রক্রিয়াতেও গতি এসেছে। যারা খারিজের আবেদন করছেন, তাদের অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দ্রুত নিষ্পত্তি করে দেওয়া হচ্ছে।
চলতি ৯ মাসে ভূমি উন্নয়ন কর আদায় হয়েছে ১ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। গত অর্থবছরে পুরো বছরে আদায় ছিল ১ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। মিসকেস নিষ্পত্তি হয়েছে ৪৫৭টি, যা আগের বছরের ৪৩৮টির চেয়ে বেশি।
দায়িত্ব নেওয়ার পর ভূমি সেবা আরও সহজলভ্য ও স্বচ্ছ করতে ভূমি সহায়তা কেন্দ্র উদ্বোধন করেন মাহমুদুল হাসান। নামজারি, খাজনা আদায়, খাসজমি ব্যবস্থাপনা, হাট-বাজার ইজারা ও অর্পিত সম্পত্তির লিজ নবায়নেও গতি আনা হয়েছে।
নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে তিনি নিয়মিত মোবাইল কোর্ট, অবৈধ দখল উচ্ছেদ ও মাদকবিরোধী অভিযান চালাচ্ছেন। সম্প্রতি রানিরহাট এলাকায় সরকারি একটি খাল অবৈধ দখলমুক্ত করে পানি প্রবাহ ফিরিয়ে আনা হয়েছে। অবৈধ হাট-বাজার উচ্ছেদ, খাসজমি বন্দোবস্ত এবং জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুত রোধেও অভিযান অব্যাহত রয়েছে। প্রতি মাসে গড়ে ৭-৮টি অভিযান চালান তিনি। গত জানুয়ারি মাসে ১০টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে ২৫ লাখ ১৬ হাজার ৬০০ টাকা অর্থদণ্ড এবং ১৭টি মামলায় ৮ জনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
সেবা নিতে আসা নাগরিকরা সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। মির্জাপুর এলাকার শাহিন বলেন, “খারিজ আবেদনে ভুল ছিল। এসিল্যান্ড সাহেবের কাছে এসে অভিভূত হয়েছি। তিনি অত্যন্ত আন্তরিক। ২-৩ মিনিটের মধ্যে কাজ করে দিয়েছেন। সরকারি অফিসে এমন সেবা দেখে আনন্দিত।”
পৌর শহরের নাসরিন আক্তার পুটি বলেন, “পূর্বের এসিল্যান্ডদের তুলনায় বর্তমানের কাজের গতি ও সেবার মান অনেক ভালো হয়েছে।”
সুঘাট এলাকার এক সেবাগ্রহীতা বলেন, “এখানে সাধারণ মানুষ ও কৃষকদের কোনো হয়রানি হয় না। সবাই সমান। তবে একজন পূর্ণাঙ্গ ভূমি সহকারী (নায়েব) নিয়োগের প্রয়োজন রয়েছে।”
মোঃ মাহমুদুল হাসান বলেন, “ভূমি অফিস নিয়ে মানুষের অনেক অভিযোগ। দায়িত্ব নেওয়ার পর আমি প্রতিটি ফাইলকে শুধু ফাইল হিসেবে নয়, মানুষের সঞ্চয় ও স্বপ্ন হিসেবে দেখেছি। তাই ৯টা-৫টার চিন্তা বাদ দিয়ে প্রয়োজনে রাত ৮-৯টা পর্যন্ত কাজ করেছি। সরকারি ২৮ দিনের চেয়েও দ্রুত নিষ্পত্তির চেষ্টা করছি।”
তিনি আরও বলেন, “এলাকাবাসীর সহযোগিতা ও ভালোবাসায় কাজগুলো সফলভাবে চালিয়ে যাচ্ছি। এ সহযোগিতা অব্যাহত থাকলে সবাই ভালো কাজে অনুপ্রাণিত হবেন।”
স্থানীয়ভাবে এই সাফল্য প্রশংসিত হলেও সেবাগ্রহীতারা ভূমি সহকারী (নায়েব) সংকটের কথা তুলে ধরেছেন। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, এ সংকট সমাধান করা গেলে সেবার মান আরও উন্নত হবে।