
আব্দুর রউফ রিপন, নওগাঁ
উচ্চ আদালতে মামলার জট কমাতে ও প্রত্যন্ত এলাকার গরীব-অসহায় মানুষদের কাছে সহজেই বিচারিক সুবিধা পৌছে দেওয়ার লক্ষ্যে ছোট ছোট ফৌজদারী বিষয়টি স্থানীয় ভাবে নিষ্পত্তি করার লক্ষ্যে সরকার দেশব্যাপী গ্রাম আদালত কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। প্রতিটি ইউনিয়নে সপ্তাহের একটি নির্দিষ্ট দিনে গ্রাম আদালতের মাধ্যমে ছোট ছোট ফৌজদারী ভিত্তিক সমস্যাগুলো সমাধান করা হয়। এই আদালত থেকে যেমন সুবিধা পাচ্ছে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ তেমনি ভাবে চরম হয়রানীর শিকারও হওয়ার ঘটনা ঘটছে।
বিশেষ করে যখন গ্রাম আদালতে করা অভিযোগগুলো নিষ্পত্তি করার জন্য আদালতের বিচারক ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার ও স্থানীয় নেতাদের উপর দায়িত্ব প্রদান করছেন তখনই অভিযোগটি দ্রুত শেষ না করে সেই অভিযোগকে আয়ের উৎস হিসেবে গ্রহণ করে মাসের পর মাস বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। আবার মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে আদালতের প্রতিনিধি ও স্থানীয় নেতারা বিভিন্ন পক্ষ গ্রহণ করায় চরম ভাবে হয়রানীর শিকার হচ্ছেন ভুক্তভোগীরা। বিশেষ করে যারা না বুঝে জমি সংক্রান্ত সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে গ্রাম আদালতে অভিযোগ করেন তারা নেতা ও গ্রাম আদালতের প্রতিনিধিদের দালালী আর হয়রানীতের চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন বলে ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে জানা গেছে।
ফলে গ্রাম আদালতের প্রতি দিন দিন বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষরা আস্থা হারিয়ে ফেলছেন। তেমনি ভাবে বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলার সান্তাহার ইউনিয়নের গ্রাম আদালত বর্তমানে অনিয়ম, দালালী আর হয়রানীর আখড়ায় পরিণত হওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। গ্রাম আদালতে দাখিল করা অভিযোগ সর্বোচ্চ ৯০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করার নিয়ম থাকলেও সম্প্রতি প্রায় ৭মাস পর জমি সংক্রান্ত একটি অভিযোগ স্থানীয় দালালদের সহযোগিতা নিয়ে স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে নিষ্পত্তি করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন কর্মকান্ডের মাধ্যমে সান্তাহার ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান ভিভিআইপি চেয়ারম্যান হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছেন। এছাড়া জমি সংক্রান্ত সমস্যা সমাধানের নিয়ম গ্রাম আদালতের না থাকলেও অর্থ আয়ের ভালো একটি উৎস হিসেবে আদালতের প্রতিনিধিরা জমি সংক্রান্ত অভিযোগগুলো লুফিয়ে নিচ্ছেন আর দালালী এবং হয়রানীর শিকার হচ্ছেন ইউনিয়নের অসহায় মানুষরা।
আদমদীঘি উপজেলার শেষ সীমানায় অবস্থিত অবহেলিত একটি গ্রাম দড়িয়াপুর। যে গ্রামটির চলাচলের একমাত্র রাস্তাটি এখনো মাটির। গ্রামটি শেষ সীমানায় অবস্থিত হওয়ায় সকল উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছে বছরের পর বছর। দুটি জেলার তিনটি উপজেলার মোহনায় অবস্থিত হওয়ায় গ্রামটি মাদক ব্যবসায়ীদের অভয়ারন্যে পরিণত হয়েছে। তবুও নজর নেই কারো। একাধিকবার গ্রামে চলমান মাদক ব্যবসা আর জুয়ার আসরের বিষয়টি পুলিশ প্রশাসনকে জানিয়েও কোন লাভ হয়নি বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
এই গ্রামের বাসিন্দা মৃত-আমজাদ হোসেন মাস্টারের ছেলে আব্দুর রউফ (সাংবাদিক রিপন) সান্তাহার ইউনিয়ন পরিষদের গ্রাম আদালতে করা মাত্র এক শতাংশ জমি প্রাপ্তির মিথ্যে অভিযোগের চরম হয়রানীর শিকার হয়েছেন। দীর্ঘ ৭মাস পর আদালতের বিচারক বাদীর সঙ্গে আঁতাত করা সান্তাহার ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক তাজ উদ্দিন ও পরিষদের মেম্বার সাইদুল ইসলামের তৈরি করা ফলাফলের উপর রায় প্রদান করেছেন। এতে করে বিবাদী আব্দুর রউফ গ্রাম আদালতের প্রতিনিধি ও স্থানীয় বিএনপি নেতা তাজ উদ্দিনের অনৈতিক প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় সঠিক বিচার প্রাপ্ত হননি বলে অভিযোগ করেছেন।
বিবাদী আব্দুর রউফ জানান একই গ্রামের মৃত-আজাদ মিস্ত্রির স্ত্রী ফিরোজা ১৯৮০সালে ৩১দাগে বিক্রি হওয়া এক শতাংশ জমি মৃত-আমজাদ হোসেনের কাছ থেকে পাবে মর্মে গত বছরের অক্টোবর মাসে সান্তাহার ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক তাজ উদ্দিনের সহযোগিতায় ইউনিয়ন পরিষদের গ্রাম আদালতে একটি অভিযোগ দায়ের করেন। অথচ আমজাদ হোসেন ২০২৪ সালে মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত বাদীপক্ষ জমি পাবে বলে দাবী কোন দিন জানায়নি। অভিযোগের ভিত্তিতে গ্রাম আদালতের বিচারক ও সান্তাহার ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান নাজিম উদ্দিন গত বছরের নভেম্বর মাসে ১০তারিখে গ্রামে জমি জরিপ করার বিষয়ে প্রথম বৈঠকের কথা জানান। গ্রাম আদালতের প্রতিনিধি, দুই পক্ষের লোকজন ও সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই দিন অভিযোগটি নিষ্পত্তি করতে না পারায় পুনরায় দিন নির্ধারণ করা হয়। এরপর একাধিকবার কখনোও ইউনিয়ন পরিষদে আবার কখনো গ্রামে বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও তা সমাধান হয় না। এর মধ্যে বাদী পক্ষ ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার সাইদুল ইসলাম ও সান্তাহার ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক তাজ উদ্দিনের সঙ্গে মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে যে ভাবেই হোক তারা বিবাদীর কাছ থেকে জমি নিয়ে দিবে মর্মে চুক্তিবদ্ধ হোন।
গত মার্চ মাসে বাদী আব্দুর রউফ খারিজ সম্পন্ন হওয়া রাস্তা সংলগ্ন অন্য দাগে তার ক্রয় করা জায়গায় সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করতে গেলে জমির দক্ষিণ পাশে প্রাচীর নির্মাণে বাঁধা প্রদান করে বাদী ফিরোজা ও তার পরিবারের সদস্যরা। তাদের খতিয়ানভুক্ত জমি কম আছে মর্মে তারা নাকি ক্রয় করা ওই জমিতে জমি পাবে দাবী জানায়। বিষয়টি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানকে জানালে তিনি জানান বাদী পক্ষের জমি দাবী ৩১দাগে। তারা অন্যদাগের জমি কিভাবে দাবী করেন? এরপর চেয়ারম্যান তার প্রতিনিধি পাঠিয়েও বিষয়টি সমাধান করতে পারেননি। পরবর্তিতে গত এপ্রিল মাসে বসে চেয়ারম্যান পরিষদের মেম্বার, সাংবাদিক ও স্থানীয় বিএনপি নেতা তাজকে বিষয়টি সমাধান করার দায়িত্ব প্রদান করেন। এরমধ্যে তাজ ও মেম্বার সাইদুল ইসলাম বাদী পক্ষের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়ে একটি বৈঠকের আয়োজন করেন। ওই বৈঠকে দিনব্যাপী জমি জরিপ শেষে আলোচনায় যখন দেখা যায় বাদী পক্ষ কোন ভাবেই জমি পাচ্ছে না তখন শেষ সময়ে এসে তাজ বলেন যে সাংবাদিকের ২০২৪ সালে করা জমির খারিজ যাচাই করতে হবে। পুনরায় একটি বৈঠকের একটি দিন ধার্য্য করা হলে ওই দিন বাদী পক্ষের সার্ভেয়ার না আসার কারণে বৈঠক বাতিল হয়। অথচ শুরুর দিকে চেয়ারম্যান প্রতিনিধি না পাঠিয়ে নিজে উপস্থিত হতেন তাহলে অভিযোগটি নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই শেষ করা সম্ভব হতো। অপরদিকে যতবার ইউনিয়ন পরিষদ থেকে প্রতিনিধিরা বৈঠকে উপস্থিত হয়েছেন ততবার তাদেরকে সম্মানী ও আসা-যাওয়ার জ্বালানী খরচ প্রদান করার পাশাপাশি যাবতীয় বিষয়ে খরচ করতে হয়েছে।
আব্দুর রউফ আরো জানান সর্বশেষ চলতি মে মাসের শুরুর দিকে বিভিন্ন দিক থেকে চেয়ারম্যানকে সমস্যাটি নিষ্পত্তি করতে চাপ সৃষ্টি করলে আবারো চেয়ারম্যান ওই সকল ব্যক্তিদের একটি বৈঠক আয়োজনের নির্দেশ প্রদান করেন। সেই বৈঠকে তাজ ও তার দল উপস্থিত থেকে বিবাদী পক্ষের সার্ভেয়ারকে কোন সুযোগ না দিয়েই বাদীর জমি সংলগ্ন বিবাদীর ক্রয় করা জমির দুই পাশের জমির সীমানা ঠিক রেখে শুধুমাত্র বিবাদীর ২৭দাগের জমির একটি সীমানা ভুয়া ভাবে নির্ধারণ করে। এরপর বৈঠক শেষে চেয়ারম্যান এসে তাজের পূর্বপরিকল্পনা অনুসারে করা ছক অনুসারে বিবাদীর ২০০৪ সালে ক্রয় করা জমির একটি সীমানা অবৈধ ভাবে ভিতরে প্রবেশ করে প্রায় ২হাত জমি বাদীকে ছেড়ে দেওয়ার রায় প্রদান করেন। দালালদের অর্থের বিনিময়ে আঁতাত করে তৈরি করা ছকের উপর নির্ভর করে গ্রাম আদালতের বিচারকের এমন রায় প্রদান সত্যিই হতাশাজনক। পরবর্তিতে সরকারি ভাবে জমি জরিপ ও জমির এমন সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে দ্রুতই সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের দ্বারস্থ হওয়ার কথা জানান বিবাদী আব্দুর রউফ।
রাণীনগর দলিল লেখক সমিতির অন্যতম সদস্য ও দলিল বিশেজ্ঞ মোকলেছুর রহমান মুহরী জানান সিএস, এমএমআর, আরএস খতিয়ান ও খারিজ অনুসারে আব্দুর রউফের অংশের জমি ও জমির দখল ঠিক আছে। বরং আব্দুর রউফ তার পিতার ক্রয় করা সম্পত্তির কিছু জমি এখনো বাদী পক্ষ দখল করে আছে। বাদী পক্ষের সঙ্গে সার্ভেয়ার মোস্তাক, তাজ ও মেম্বার সাইদুল ইসলামের আঁতাতের কারণে অনেকটাই অন্যায় ভাবেই বিবাদীর কাছ থেকে কিছু জমি বাদী পক্ষকে দেয়া হয়েছে।
এই বিষয়ে সান্তাহার ইউপির প্যানেল চেয়ারম্যান নাজিম উদ্দিন জানান একজন চেয়ারম্যানকে অনেক কাজ করতে হয়। তাই গ্রাম আদালতের বিচারক হিসেবে চেয়ারম্যানকে প্রতিটি বিচার কাজে সরেজমিনে যাওয়া সম্ভব হয় না। তাই একটি অভিযোগ কম সময়ের মধ্যে শেষ করা সম্ভব না হলে পরিষদের প্রতিনিধি ও স্থানীয় দলীয় নেতাদের দায়িত্ব প্রদান করা হয়। এতে করে যদি কোন ভুক্তভোগীরা হয়রানীর শিকার হলে অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা গ্রহণের কথা জানান। সম্প্রতি দড়িয়াপুর গ্রামের জমি সংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়ে তিনি জানান দীর্ঘদিন পর হয়রানী ছাড়াই সমস্যাটি সমাধান করা হয়েছে। তাজ উদ্দিন দলীয় নেতা বলে তাকে ওই গ্রামের জমি সংক্রান্ত সমস্যাটি দ্রুত সমাধানের লক্ষ্যে বিচারিক আদালতের প্রতিনিধি হিসেবে তাজকে দায়িত্ব প্রদান করার কথা জানান তিনি।
আদমদীঘি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোছা: মাসুমা বেগম জানান গ্রাম আদালত খুব সামান্য পরিমাণ জমির সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে গ্রাম আদালতে অভিযোগ নিয়ে বিচারিক কার্যক্রম চালাতে পারবে। গ্রাম আদালত মূলত ফৌজদারী বিষয়ে অভিযোগগুলো আমলে নিতে পারবে। গ্রাম আদালতে অভিযোগ দিয়ে কেউ হয়রানীর শিকার হলে অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা গ্রহণ করার কথা জানান এই কর্মকর্তা।