
শেরপুর (বগুড়া) প্রতিনিধিঃ
কৃষকেরা সরাসরি পাইকারদের কাছে পণ্য বেচবেন, মধ্যস্বত্বভোগীদের হাতে ঠকবেন না—এ উদ্দেশ্যে প্রায় ১৯ বছর আগে বগুড়ায় চারটি গ্রোয়ার্স মার্কেট গড়া হয়েছিল। এখন সেসব বাজারের কোনোটিতে কৃষকের দোকান ভাড়া দেওয়া হয়েছে অন্য ব্যবসায়ীদের কাছে, কোনোটি সপ্তাহে দুই দিনের বেশি সচল থাকে না, আবার কোনোটি চলছে প্রভাবশালীদের নিয়ন্ত্রণে। নারী কৃষকদের জন্য রাখা আলাদা কর্নার সব জায়গাতেই কেবল খাতায়।
কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতেই এসব বাজার তৈরি হয়েছিল। বাজারগুলোতে কৃষকের সরাসরি পণ্য বিক্রির কথা ছিল পাইকারদের কাছে। রাখা হয়েছিল গ্রেডিং, প্যাকিং, ওয়াশিং, পণ্য ওঠানো-নামানো ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা। কিন্তু প্রায় দুই দশক পর এসব বাজারের অনেকটাই কৃষকের কাজে আসছে না। কৃষকের চেয়ে মধ্যস্বত্বভোগী ব্যবসায়ীদের উপস্থিতিই এখন বেশি বলে অভিযোগ উঠেছে।
‘উত্তর-পশ্চিম শস্য বহুমুখীকরণ’ প্রকল্পের (এনসিডিপি) আওতায় বগুড়ায় চারটি বাজার তৈরি হয়। ২০০৭-০৮ অর্থবছরে প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা ব্যয়ে এসব বাজার নির্মাণ করা হয়। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের অর্থায়নে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) অবকাঠামো নির্মাণ করে। প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ছিল উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষকদের উচ্চমূল্যের ফসল উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে সহায়তা করা। প্রকল্পটির মেয়াদ ২০০৯ সালে শেষ হয়।
বাজারগুলোতে ৩৩টি উচ্চমূল্যের ফসল, যেমন সবজি, ফল, মসলা ও দানা শস্যের বহুমুখীকরণ ও নিবিড় উৎপাদনের মাধ্যমে কৃষকের আয় বাড়ানো, দারিদ্র্য কমানো এবং কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্য নেওয়া হয়েছিল। পরিকল্পনা অনুযায়ী, বাজারের এক থেকে দেড় কিলোমিটারের মধ্যে থাকা কৃষকেরা তাঁদের উৎপাদিত পণ্য এখানে এনে বিক্রি করবেন। পরে এসব পণ্য বড় পাইকারের মাধ্যমে ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাঠানো হবে। কৃষকদের এ জন্য বিভিন্ন ধাপে প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়েছিল। বাজারে প্যাকিং হাউস, গ্রেডিং, সর্টিং, ওয়াশিং ও ড্রাইং ইউনিট, লোডিং-আনলোডিং এলাকা, স্টোরেজ গোডাউন, নারী কর্নার, বাজার ব্যবস্থাপনা কমিটির কার্যালয় ও প্রশিক্ষণকেন্দ্রসহ বিভিন্ন সুবিধা রাখা হয়।
শেরপুরের পল্লী উন্নয়ন একাডেমি (আরডিএ) এলাকার পাইকারি বাজারে কৃষকের জন্য বরাদ্দ দোকান অন্য ব্যবসায়ীদের কাছে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। এ বাজারের এক ব্যবসায়ী বলেন, দুই বছর আগেও বাজারটি ভালো চলত। তবে মহাসড়কে ফ্লাইওভার না থাকায় সড়কের আইল্যান্ডের কারণে যানবাহন পারাপারে সমস্যা হচ্ছে। বরাদ্দ পাওয়া ১৬ জন ব্যবসায়ীর মধ্যে ১৫ জন অন্যত্র ব্যবসা করছেন। স্থানীয়রা জানান, তাঁদের বরাদ্দ পাওয়া দোকানগুলো মুদি দোকান, লুঙ্গির দোকান ও ওষুধের ফার্মেসি হিসেবে অন্যদের কাছে ভাড়া দেওয়া হয়েছে।
শেরপুরের মির্জাপুর এলাকার এনসিডিপি বাজারটি এখন কার্যত অচল। সরেজমিনে দেখা যায়, কৃষকের উৎপাদিত পণ্য সরাসরি এখানে এনে বিক্রির যে ব্যবস্থা থাকার কথা ছিল, তা নেই। ছয়জন মহাজন অন্য জেলা থেকে পণ্য কিনে তা ভবনে এনে বিক্রি করছেন। মার্কেটের বাইরে ৩৪টি কাঁচামাল দোকান থেকে প্রতি মাসে ১৫০-২০০ টাকা ভাড়া নেন মহাজনেরা। সেখানে নারী কর্নার শুধু খাতায়। এমনটি জানান ব্যবসায়ী মাসুদ রানা ও মহাজন আবদুল মান্নান।
শাহজাহানপুর উপজেলার দুবলাগাড়ী হাটের গ্রোয়ার্স মার্কেটেও একই চিত্র। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, সপ্তাহে দুই দিন বাজারটি কিছুটা সচল থাকে। মার্কেট প্রতিষ্ঠার পর থেকে নারী কর্নার চালু হয়নি। স্থানীয় সদস্য কৃষকদের বাইরে অন্য একটি ব্যবসায়ী গোষ্ঠী বাজারটি পরিচালনা করছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
শিবগঞ্জ উপজেলার মহাস্থানে পাইকারি সবজির বাজারে কর্মচাঞ্চল্য দেখা গেলেও কৃষকদের জন্য নির্ধারিত লক্ষ্য পুরোপুরি পূরণ হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় এক কৃষক বলেন, খুচরা বাজারটি স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণে। বাজার কমিটির কার্যক্রমও কম।
বগুড়ার সিনিয়র কৃষি বিপণন কর্মকর্তা (দায়িত্বপ্রাপ্ত) মো. মোরশেদ আল মাহমুদ বলেন, ২০০৯ সালে প্রকল্পটি একটি এনজিওর সঙ্গে যুক্ত ছিল। কৃষকদের একটি গ্রুপের সদস্যদের নিয়ে বাজার পরিচালনার ব্যবস্থা করা হয়। তাঁদের মধ্য থেকে নির্দিষ্টসংখ্যক সদস্যকে বরাদ্দ দেওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। বাজারে কৃষকদের পণ্য গ্রেডিং এবং লোড-আনলোডের ব্যবস্থা রয়েছে। এসব স্থাপনা সংস্কার করা হলে কৃষকেরা আরও সুবিধা পাবেন। বাজারের সদস্যরাই পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, অনেক ব্যবসায়ী আবেদন করেননি। এ কারণে তাঁরা বরাদ্দ পাননি। নিয়ম মেনেই বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। নারীদের সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করা হবে। কিছু নীতিমালা পরিবর্তন করা হলে বাজারগুলো আরও সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে।