
জয়পুরহাট প্রতিনিধি
পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় মাছ চাষ শুরু করেছিলেন মো. আব্দুর রশিদ মন্ডল। ছোটবেলার সেই আগ্রহই ধীরে ধীরে পরিণত হয়েছে দীর্ঘ অভিজ্ঞতায়। প্রায় ৩৬ বছর ধরে মাছ চাষ ও হ্যাচারী ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত থেকে তিনি এখন গড়ে তুলেছেন নিজের একটি মাছের হ্যাচারী। জয়পুরহাটের আক্কেলপুর উপজেলার গোপীনাথপুর গ্রামে প্রতিষ্ঠিত মন্ডল মৎস্য খামার এন্ড হ্যাচারী থেকে বর্তমানে বিভিন্ন প্রজাতির মাছের রেনু ও পোনা উৎপাদন করে স্থানীয়সহ দেশের বিভিন্ন এলাকার মাছচাষিদের কাছে সরবরাহ করা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটি রেনু ও পোনা বিক্রি করে প্রতি মাসে প্রায় ৮ লাখ টাকার ব্যবসা করছে।
সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, হ্যাচারীজুড়ে চলছে ব্যস্ততা। কোথাও ব্রুড মাছের পরিচর্যা, কোথাও ডিম সংগ্রহ, আবার কোথাও ডিম থেকে রেনু উৎপাদনের কাজ। অন্যদিকে নির্দিষ্ট বয়সের রেনুগুলোকে বড় করে পোনা তৈরির জন্য আলাদা ট্যাংক ও পুকুরে পরিচর্যা করা হচ্ছে। কর্মীরা নিয়মিত পানির মান পরীক্ষা, খাদ্য প্রয়োগ এবং পরিচর্যার বিভিন্ন কাজ করছেন। অর্ডার অনুযায়ী অক্সিজেনযুক্ত প্যাকেটে রেনু ও পোনা ভরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাঠানোর প্রস্তুতিও চলছিল।
২০২৫ সালে প্রতিষ্ঠিত এই হ্যাচারীতে বর্তমানে দেশি মাগুর, শিং, পাবদা, গুলশা, দেশি ট্যাংরাসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছের রেনু উৎপাদন করা হয়। উৎপাদনের পর সেগুলো পরিচর্যার মাধ্যমে পোনায় রূপান্তর করা হয়। পরে স্থানীয় মাছচাষিদের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জেলার খামারিদের কাছেও সরবরাহ করা হয় এসব রেনু ও পোনা।
হ্যাচারীর স্বত্বাধিকারী ও উদ্যোক্তা মো. আব্দুর রশিদ মন্ডল বলেন, ১৯৯০ সালে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় মাছ চাষ শুরু করেন তিনি। দীর্ঘ সময় মাছ চাষের সঙ্গে যুক্ত থাকার পাশাপাশি ২০১২ সালে কীটনাশকের ব্যবসাও করেছেন। তবে মাছ চাষের প্রতি আগ্রহ থেকেই যায়। সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে ২০২৫ সালে প্রতিষ্ঠা করেন নিজের হ্যাচারী। এখন মানসম্মত রেনু ও পোনা উৎপাদনের মাধ্যমে মাছচাষিদের প্রয়োজন মেটানোর চেষ্টা করছেন। নিজে এলাকার সাতটি পুকুর কট কবলা নিয়ে মাছ চাষসহ হ্যাচারীতে রেণু উৎপাদন ভবিষ্যতে আরও বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে বলে জানান তিনি।
হ্যাচারীর পরিচালক সাদ্দাম আলী জানান, তিনি প্রায় ১৯ বছর ধরে মাছের হ্যাচারীতে কাজ করছেন। বগুড়া, আদমদীঘি ও আক্কেলপুরের বিভিন্ন হ্যাচারীতে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। ২০১২ সালে রাজশাহী বিভাগীয় মৎস্য অধিদপ্তরের প্রশিক্ষণও নিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, ব্রুড মাছ নির্বাচন থেকে শুরু করে ডিম সংগ্রহ, ডিম ফুটিয়ে রেনু উৎপাদন, পরিচর্যা এবং পোনা তৈরির প্রতিটি ধাপই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সামান্য অসতর্কতায় উৎপাদনে ক্ষতি হতে পারে। তাই পুরো প্রক্রিয়ায় নিয়মিত তদারকি করা হয়।
প্রতিষ্ঠানটির তথ্যমতে, প্রতি সপ্তাহে প্রায় ৩০ লাখ রেনু বিক্রি হয়। রেনু ও পোনা বিক্রি করে প্রতি মাসে প্রায় ৮ লাখ টাকার ব্যবসা করছে প্রতিষ্ঠানটি। হ্যাচারী ও পুকুরে স্থানীয় ও অভিজ্ঞ বেশি কয়েকজন কর্মী নিয়মিত কাজ করছেন। স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি মাছচাষিদের কাছে প্রয়োজনীয় রেনু ও পোনা সরবরাহেও ভূমিকা রাখছে প্রতিষ্ঠানটি।
হ্যাচারীর টেকনিশিয়ান মো. সাজু বলেন, প্রতিদিন ভোর থেকে রাত পর্যন্ত রেনুর পরিচর্যা, খাদ্য ব্যবস্থাপনা, পানির মান নিয়ন্ত্রণ এবং পোনা উৎপাদনের কাজে ব্যস্ত থাকতে হয়। সঠিক পরিচর্যা নিশ্চিত করা গেলে ভালো মানের পোনা উৎপাদন সম্ভব হয়।
স্থানীয় মাছচাষি রতন মালী বলেন, কয়েক বছর ধরে তিনি এই হ্যাচারী থেকে রেনু ও পোনা সংগ্রহ করছেন। মান ভালো হওয়ায় মাছের বেঁচে থাকার হার বেশি থাকে এবং উৎপাদনও সন্তোষজনক হয়। স্থানীয়ভাবে প্রয়োজনীয় পোনা পাওয়া যাওয়ায় সময় ও পরিবহন খরচও কমে এসেছে।
আক্কেলপুর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সাদিয়া সিদ্দিকী জানান, আক্কেলপুর উপজেলায় যারা মৎস্যচাষী আছেন তারা পুকুর, মাছচাষ, পানি পরীক্ষা বিভিন্ন কাজে আমাদের দপ্তরে আসেন। আমরা তাদেরকে সব ধরনের সহযোগিতা আমরা করি। এছাড়া এখানে বর্তমানে নার্সারী পুকুরের প্রচলন বাড়ছে। এর আগে এখানে প্রচলিত পদ্ধতিতে মাছচাষ হলেও এখন আধুনিক পদ্ধতিতে আনার চেষ্টা চলছে। এক্ষেত্রে সরকারি সুবিধা আরো বাড়ানো হলে এ এলাকার মানুষরা আরো বেশি সুবিধা পাবে।
শৈশবে মাছ চাষ দিয়ে শুরু হওয়া আব্দুর রশিদ মন্ডলের পথচলা এখন একটি পূর্ণাঙ্গ হ্যাচারীতে এসে পৌঁছেছে। দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং নিয়মিত পরিচর্যার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই উদ্যোগ স্থানীয় মাছচাষিদের কাছে মানসম্মত রেনু ও পোনার একটি নির্ভরযোগ্য উৎস হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে।