
আরমান হোসেন, জয়পুরহাট
বয়স প্রায় ৭৫ বছর। এ বয়সে অনেকেই কর্মজীবন থেকে অবসর নেন। কিন্তু জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার মজিদা বেগমের জীবনে অবসরের সুযোগ নেই। অসুস্থ স্বামী, দুই মেয়ে ও নাতি-নাতনিদের মুখে খাবার তুলে দিতে প্রতিদিন বিকেলে রাস্তার পাশে চুলা জ্বালিয়ে ঝাল পিঠা বিক্রি করেন তিনি। বয়সের ভার শরীরে পড়লেও জীবনসংগ্রামের কাছে হার মানেননি এই বৃদ্ধা।
কালাই উপজেলার থুপসারা আদর্শপাড়ার বাসিন্দা মজিদা বেগম। কয়েক বছর আগেও তার স্বামী ময়েজ উদ্দিন সরকার কসাইয়ের কাজ করে সংসার চালাতেন। কিন্তু গরুর হাটে দুর্ঘটনায় কোমরে গুরুতর আঘাত পাওয়ার পর তিনি আর আগের মতো কাজ করতে পারেন না। সংসারের প্রধান আয়ের পথ বন্ধ হয়ে গেলে জীবিকার দায়িত্ব এসে পড়ে মজিদা বেগমের কাঁধে।
প্রায় পাঁচ বছর আগে, ৭০ বছর বয়সে, জীবিকার নতুন পথ হিসেবে ঝাল পিঠা বিক্রি শুরু করেন তিনি। তখন থেকে প্রতিদিন বিকেল ৪টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত কালাইয়ের প্রধান সড়কের পাশে বসে পিঠা বিক্রি করছেন।
মজিদা বেগম বলেন, "শরীর আর আগের মতো চলে না। তারপরও সংসারের জন্য বসতেই হয়। দোকান না বসালে সেদিনের বাজার হয় না। যতদিন শরীরে শক্তি আছে, ততদিন কাজ করে যেতে চাই।"
চালের গুঁড়া, ডিম, জিরা, ধনিয়াসহ বিভিন্ন মসলা মিশিয়ে তৈরি ঝাল পিঠা খাঁটি সরিষার তেলে ভেজে বিক্রি করেন তিনি। প্রতিটি পিঠার দাম ১০ টাকা। প্রতিদিন প্রায় ৫০০ টাকার কাঁচামাল কিনে দিন শেষে বিক্রি হয় ৬০০ থেকে ৭০০ টাকার। সব খরচ বাদ দিয়ে হাতে থাকে গড়ে ২০০ টাকার মতো। এর সঙ্গে তিন মাস পরপর পান ১ হাজার ৮০০ টাকার বৃদ্ধভাতা। এই সামান্য আয়েই চলে অসুস্থ স্বামী, দুই মেয়ে ও দুই নাতি-নাতনিকে নিয়ে তার ছয় সদস্যের সংসার।
এই পথচলার শুরু থেকেই পাশে আছেন স্থানীয় মুদি ব্যবসায়ী মো. কামরুজ্জামান। তিনি বলেন, "সংসারের কষ্ট দেখে তাকে ঝাল পিঠা বিক্রি করার পরামর্শ দিয়েছিলাম। এখনও প্রতিদিন প্রয়োজনীয় সব উপকরণ আমার দোকান থেকেই নেন। দিনের বিক্রি শেষে সবার আগে বাকির টাকা পরিশোধ করেন। নিজের কষ্টের আয়েই সংসার চালানোর চেষ্টা করেন।"
শীতের মৌসুমে ঝাল পিঠার চাহিদা সবচেয়ে বেশি থাকে। তখন প্রতিদিন ২৫০ থেকে ৩০০টি পর্যন্ত পিঠা তৈরি করেন মজিদা বেগম। তবে বৃষ্টি কিংবা প্রতিকূল আবহাওয়াতেও যতটা সম্ভব দোকান বন্ধ রাখেন না। কারণ, একদিন বিক্রি না হলে সংসারের খরচ জোগাড় করা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
নিয়মিত ক্রেতারা জানান, শুধু পিঠার স্বাদ নয়, মজিদা বেগমের সংগ্রামী জীবনও তাদের টানে। অনেকেই পিঠা কিনতে এসে তার খোঁজখবর নেন, কথা বলেন, সাহস জোগান।
বিক্রির ফাঁকে মাঝেমধ্যে কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকেন মজিদা বেগম। ব্যস্ত সড়কে ছুটে চলা মানুষ আর যানবাহনের দিকে তাকিয়ে যেন একটু বিশ্রাম নেন। তবে সেই বিরতি বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না। ক্রেতা এলেই আবার চুলার পাশে ফিরে পিঠা তৈরিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। তার কাছে প্রতিটি পিঠাই যেন পরিবারের একবেলার খাবারের নিশ্চয়তা।
মজিদা বেগমের কোনো বড় স্বপ্ন নেই। তার একমাত্র চাওয়া, যতদিন শরীরে শক্তি আছে ততদিন নিজের পরিশ্রমে পরিবারের পাশে থাকতে পারবেন। বয়সকে হার মানিয়ে তার এই সংগ্রাম শুধু একটি পরিবারের জীবিকার গল্প নয়; এটি আত্মসম্মান, দায়িত্ববোধ ও বেঁচে থাকার অদম্য ইচ্ছাশক্তিরও এক অনন্য দৃষ্টান্ত।