
জয়পুরহাট প্রতিনিধি
১৩ বছর ধরে একই শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করছেন তারা। প্রতিদিনের মতো শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দিচ্ছেন বই-খাতা, শেখাচ্ছেন পড়াশোনা। কিন্তু মাস শেষে নিজেদের হাতে আসে না কোনো বেতন। সংসারের খরচ, সন্তানদের প্রয়োজন কিংবা নিত্যদিনের ব্যয়—সবকিছুই সামলাতে হচ্ছে অনিশ্চয়তার মধ্যে। তারপরও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের কথা ভেবে বিদ্যালয়ে আসা বন্ধ করেননি শিক্ষক-কর্মচারীরা।
এ চিত্র জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার নান্দাইল দিঘী অটিস্টিক ও প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ের।
দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে এমপিওভুক্তির অপেক্ষায় রয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে ১৪৬ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। তাদের পাঠদানে রয়েছেন ১৮ জন শিক্ষক। বিদ্যালয়ের বিভিন্ন কাজে যুক্ত আছেন আরও ১০ জন কর্মচারী।
শারীরিক ও মানসিক নানা প্রতিবন্ধকতা নিয়ে বেড়ে ওঠা শিশুদের জন্য এ বিদ্যালয়টি শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ আশ্রয় হয়ে উঠেছে। দূর-দূরান্ত থেকে অভিভাবকেরা সন্তানদের নিয়ে আসেন এখানে। কিন্তু বিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারীদের নিজেদের জীবনেই রয়েছে বড় অনিশ্চয়তা।
বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রিপা জাহান বলেন, “আমরা দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে বিনা বেতনে প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করে যাচ্ছি। আমাদের একটাই দাবি—বিদ্যালয়টি এমপিওভুক্ত করা হোক।”
সহকারী শিক্ষক রিমা বলেন, প্রতিবন্ধী শিশুরা সমাজের বোঝা নয়, তারা সমাজের সম্পদ। তাদের উপযুক্তভাবে গড়ে তুলতেই শিক্ষকরা কাজ করছেন। কিন্তু দীর্ঘদিন কোনো বেতন না থাকায় সংসারের প্রয়োজন মেটানো কঠিন হয়ে পড়ছে। তবু শিক্ষার্থীদের কথা চিন্তা করে শিক্ষকতা চালিয়ে যাচ্ছেন তারা।
শিক্ষার্থীদের পরিবারের কাছেও বিদ্যালয়টির গুরুত্ব কম নয়। শিক্ষার্থী সুমাইয়া আক্তারের মা লাবিজা খাতুন বলেন, “আমার প্রতিবন্ধী বাচ্চা এই স্কুলে লেখাপড়া করে। ভ্যান ভাড়া দিয়ে নিয়ে আসি, আবার নিয়ে যাই। লেখাপড়াও ঠিকমতো হয়। আমি চাই এই স্কুলের উন্নতি হোক, আমাদের বাচ্চাদেরও উন্নতি হোক।”
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নওফেল আলী বলেন, প্রতিবন্ধী শিশুরা দেশের বোঝা নয়, তাদের মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তুলতেই প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলা হয়েছে। ১৩ বছর ধরে শিক্ষক-কর্মচারীরা অক্লান্তভাবে দায়িত্ব পালন করছেন। বর্তমানে ১৮ জন শিক্ষক ও ১০ জন কর্মচারী নিয়মিত কাজ করছেন, অথচ শিক্ষকরা কোনো পারিশ্রমিক পাচ্ছেন না।
তিনি বলেন, বিদ্যালয়টি এমপিওভুক্ত হলে শিক্ষক-কর্মচারীদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের জন্য আরও ভালো শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব হবে।
বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি জামাল উদ্দিন বদির জানান, শিক্ষক-কর্মচারীদের দুরবস্থার বিষয়টি বিবেচনা করে তিনি ব্যক্তিগতভাবে বিদ্যালয়ের বিভিন্ন খরচ বহন করছেন। প্রতিষ্ঠানটি চালু রাখতে এমনকি জমিও বিক্রি করতে হয়েছে তাকে।
তিনি বলেন, “আমাদের শিক্ষক ও কর্মচারীরা খুব কষ্টে জীবনযাপন করছেন। আমি নিজে যতটুকু পারছি বহন করছি। এমনকি জমি বিক্রি করেও স্কুলটি চালিয়ে যাচ্ছি। আমাদের স্কুলটির স্বীকৃতি ও এমপিওভুক্তির জন্য সরকারের কাছে একটাই অনুরোধ—বিদ্যালয়টি এমপিওভুক্ত করা হোক।”
বিদ্যালয়টি সরকারি কোনো অনুদানের আওতায় রয়েছে কি না, সেটি যাচাই করে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়।
কালাই উপজেলা সমাজসেবা অফিসার সাদিকুর রহমান মণ্ডল বলেন, “নান্দাইল দিঘী অটিস্টিক ও প্রতিবন্ধী স্কুল সম্পর্কে এইমাত্র আপনার মাধ্যমে জানতে পারলাম। আমি এখানে নতুন। স্কুলটি সরকারি অনুদানের আওতায় আছে কি না, তা আমার জানা নেই। স্কুল কর্তৃপক্ষ আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে এবং সরকার এ বিষয়ে কোনো নির্দেশনা দিয়ে থাকলে, বিদ্যালয়ের যেসব বিষয়ে সহযোগিতা প্রয়োজন, তা করার চেষ্টা করব।”
শিক্ষক-কর্মচারীদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে বিনা বেতনে দায়িত্ব পালন করলেও তারা শিক্ষার্থীদের পাশে রয়েছেন। তাদের প্রত্যাশা, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে বিদ্যালয়টির এমপিওভুক্তির বিষয়ে সরকার কার্যকর উদ্যোগ নেবে। এতে শুধু শিক্ষক-কর্মচারীদের আর্থিক অনিশ্চয়তাই কমবে না, বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রমও আরও শক্তিশালী হবে।