
জয়পুরহাট প্রতিনিধি
পাকিস্তানে হাসপাতালে চাকরি দেওয়ার কথা বলে জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার এক তরুণকে দেশটিতে নিয়ে কিডনি বিক্রির চুক্তি করা হয়েছিল—এমন অভিযোগ উঠেছে। শিহাব হোসেন (২৪) নামের ওই তরুণের দাবি, পাকিস্তানের একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়ার পর তিনি জানতে পারেন, তাঁর একটি কিডনি ছয় লাখ টাকায় বিক্রির জন্য চুক্তি হয়েছে। এরপর কিডনি অপসারণের প্রস্তুতি নেওয়া হলে কৌশলে হাসপাতাল থেকে পালিয়ে দেশে ফেরেন তিনি।
এ ঘটনায় শিহাব তাঁর বাবা সিরাজুল ইসলাম, মা রহিমা বেগম, তারেক হাজী নামের এক ব্যক্তি ও অজ্ঞাতনামা কয়েকজনের বিরুদ্ধে কালাই থানায় লিখিত অভিযোগ করেছেন। শিহাব উপজেলার আহম্মেদাবাদ ইউনিয়নের রাঘবপুর গ্রামের বাসিন্দা।
লিখিত অভিযোগে শিহাব বলেন, প্রায় দুই মাস আগে তাঁর বাবা-মা তাঁকে জানান, পাকিস্তানের একটি হাসপাতালে চাকরির ব্যবস্থা হয়েছে। এতে রাজি হয়ে তিনি বাবা-মায়ের সঙ্গে ঢাকায় যান। সেখানে বাবার পরিচিত তারেক হাজীসহ তিনজনের সঙ্গে তাঁর পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়। পরে দ্রুত তাঁর পাসপোর্ট ও ভিসার ব্যবস্থা করা হয়।
অভিযোগ অনুযায়ী, গত ২২ জুলাই দুপুরে ওই তিন ব্যক্তির সঙ্গে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে পাকিস্তানের উদ্দেশে রওনা হন শিহাব। দেশটিতে পৌঁছানোর পর তাঁকে একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
শিহাবের দাবি, পরদিন হাসপাতালের একটি ‘বোর্ড মিটিংয়ে’ তাঁকে জানানো হয়, তাঁর একটি কিডনি ছয় লাখ টাকায় বিক্রির জন্য তাঁর বাবা-মা চুক্তি করেছেন। এ জন্য তাঁর বাবা অগ্রিম তিন লাখ টাকা নিয়েছেন বলেও তাঁকে জানানো হয়। তাঁকে মেডিক্যাল ভিসায় পাকিস্তানে নেওয়ার কারণও তখন তিনি জানতে পারেন বলে অভিযোগ করেন শিহাব।
কিডনি দেওয়ার বিষয়ে আপত্তি জানালে তাঁকে হাসপাতালে আটকে রেখে অপারেশনের প্রস্তুতি নেওয়া হয় বলে দাবি তাঁর। একপর্যায়ে অন্য এক ব্যক্তির সহযোগিতায় কৌশলে হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে আসেন তিনি।
শিহাবের ভাষ্য, পরে তাঁকে পাকিস্তান বিমানবন্দরে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। গত ৩১ জুলাই দুপুরে তিনি ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ফিরে আসেন।
অভিযোগের সঙ্গে পাকিস্তানি ভিসার রেফারেন্স নম্বর ৮৮০০৬৪৫৮৮৭৬ উল্লেখ করেছেন শিহাব। দেশে ফেরার বিমানযাত্রার তথ্য হিসেবে ৩০ জুলাইয়ের CZ8070 এবং ৩১ জুলাইয়ের CZ5015 ফ্লাইটের তথ্যও দিয়েছেন তিনি।
দেশে ফেরার পর গত ১১ আগস্ট সকালে বাড়িতে গিয়ে বাবা-মায়ের কাছে বিষয়টি জানতে চান বলে অভিযোগ করেন শিহাব। তাঁর দাবি, এ সময় তাঁরা অভিযোগ অস্বীকার করে তাঁকে গালিগালাজ ও হুমকি দেন। কাউকে বিষয়টি জানালে ‘খবর আছে’ বলেও তাঁকে ভয় দেখানো হয় বলে অভিযোগ তাঁর।
শিহাব বলেন, “আমার আপন বাবা-মা প্রবাসে কাজ দেওয়ার কথা বলে কৌশলে আমার একটি কিডনি ছয় লাখ টাকার বিনিময়ে বিক্রি করে দেন। পাকিস্তানে নিয়ে হাসপাতালে কিডনি নেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হলে আমি প্রতিবাদ করি। একপর্যায়ে তাঁদের সঙ্গে আমার হাতাহাতি হয়। আমি লোকজন ও পুলিশ ডাকব বলে ভয় দেখালে তাঁদের একজন আমাকে পাকিস্তান বিমানবন্দরে নিয়ে গিয়ে টিকিট করে দিতে বাধ্য হন।”
অভিযোগের বিষয়ে জানতে রাঘবপুর গ্রামে শিহাবের বাড়িতে গেলে সেটি তালাবদ্ধ পাওয়া যায়। পরে তাঁর বাবা-মায়ের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তাঁরা বলেন, “আমরা অনেক দূরে আছি, পরে আপনাকে জানাব।” তবে শিহাবের বাবা-মা তাঁর অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “আমার ছেলে মিথ্যা বলছে।”
এ বিষয়ে কালাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিকুল ইসলাম বলেন, “এ সংক্রান্ত একটি অভিযোগ আজ দুপুরে পেয়েছি। তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
শিহাবের অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা এখনো নিশ্চিত হয়নি। তবে অভিযোগটি তদন্তে পাকিস্তানে তাঁর যাতায়াতের নথি, ভিসা, সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের তথ্য, কথিত আর্থিক লেনদেন এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগের তথ্য যাচাই করা হলে ঘটনার প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।
এর আগে কালাইয়ে কিডনি কেনাবেচার অভিযোগে একটি চক্রের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান ও মামলা হওয়ার খবরও প্রকাশিত হয়েছে। ফলে শিহাবের অভিযোগের সঙ্গে ওই চক্রের কোনো যোগসূত্র আছে কি না, সেটিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।