
বিশেষ প্রতিবেদক
নওগাঁর বরেন্দ্র অঞ্চলে দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর। বিশেষ করে জেলার পোরশা, নিয়ামতপুর, সাপাহার ও পত্নীতলার উঁচু এলাকায় পানির স্তর কমে যাওয়ার হার উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। ফলে একদিকে সেচ সংকটে পড়ছেন কৃষকরা, অন্যদিকে বিশুদ্ধ পানির তীব্র অভাবে ভোগান্তিতে পড়ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষি প্রধানত ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল। দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত সেচের জন্য গভীর নলকূপের ব্যবহার, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং জলাধার ও খালের সংখ্যা কমে যা৯ওয়ায় পানির স্বাভাবিক পুনর্ভরণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে ধীরে ধীরে পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে কৃষি উৎপাদন এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে।
স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য, এক-দেড় দশক আগেও অল্প গভীরতাতেই পানির স্তর পাওয়া যেত। কিন্তু এখন অনেক গভীরে নলকূপ বসিয়েও পর্যাপ্ত পানি মিলছে না। ফলে সেচের জন্য আগের তুলনায় অনেক বেশি খরচ করতে হচ্ছে। সেচ পাম্প চালাতে অতিরিক্ত জ্বালানি খরচের পাশাপাশি নতুন করে গভীর নলকূপ বসানোর খরচও বাড়ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় কয়েকগুণ বেড়ে গেছে।
একইসঙ্গে বিশুদ্ধ পানির সংকটও প্রকট হয়ে উঠেছে। টিউবওয়েলে পানি উঠছে না। ফলে প্রতিদিন দূরের গভীর নলকূপ থেকে পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে স্থানীয়দের। এতে সময়, শ্রম ও অর্থ তিনদিক থেকেই চাপ বাড়ছে সাধারণ মানুষের।
বরেন্দ্রে বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) সুত্রে জানা গেছে, নওগাঁ জেলার চারটি উপজেলার ১৩ টি ইউনিয়নকে অতিউচ্চ পানি সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করেছে সরকার। এর মধ্যে পোরশা উপজেলার চারটি ইউনিয়ন রয়েছে।
রোববার (১৫ মার্চ) পোরশা উপজেলার ছাওড় ইউনিয়নের লক্ষ্মীপুর, শীতলডাঙ্গা ও হাড়ভাংগা গ্রামে সরেজমিনে ঘুরে ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গ্রাম তিনটিতে গত ছয়-সাত বছর ধরে হাতে চাপা নলকূপে (টিউবওয়েল) কোনো পানি উঠে না। গভীর নলকূপ বসিয়ে সুপেয় পানি সংগ্রহ করতে হয় এসব গ্রামের বাসিন্দাদের। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের এ কষ্ট সবচেয়ে বেশি ভোগ করতে হচ্ছে। কোথাও কোথাও ৩০০ থেকে ৫০০ মিটার দূরে গিয়ে গভীর নলকূপ খাবার পানি সংগ্রহ করতে হয় গ্রামের নারীদের।
ছাওড় ইউনিয়নের দক্ষিণ লক্ষ্মীপুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, গ্রামের মেঠো রাস্তার পাশে সাব-মার্সিবল পাম্পের সাহায্যে তোলা পানি একটি ট্যাংকিতে সংরক্ষণ করা আছে। সেই ট্যাংকি থেকে সরবরাহ করা পানি ট্যাপ থেকে সংরক্ষণ করে নিয়ে যাচ্ছিলেন সুমিতা রাণী নামের এক গৃহবধূ।
পানি কোথায় নিয়ে যাচ্ছে জিজ্ঞেস করলে তিনি হাত উঁচু করে প্রায় ২০০ মিটার দূরের একটি পাড়ার দিকে ইশারা করে বললেন, 'ওই পাড়ায় যাব। হামাগের পাড়াত খাবার পানি পাওয়া যায় না। তাই প্রতিদিন এই ট্যাপ থেকে পানি লিয়ে য্যায়ে খাই। প্রতিদিন তিন-চার বালতি পানি লিয়ে যাওয়া লাগে। এত দূর থ্যাকে পানি লিয়ে য্যাতে কষ্ট হয়। কিন্তু করার কিছু নাই।'
হাড়ভাংগা গ্রামের বাসিন্দা স্কুল শিক্ষক রেজাউল ইসলাম বলেন, 'চৈত-বৈশাখ মাসে গভীর নলকূপ ও সাব-মার্সিবল পাম্প থেকেও পানি উঠে না। তখন দেখা যায়, গ্রামের এক পাড়ার লোক আরেক পাড়াতে গিয়ে যেসব গভীর নলকূপে পানি উঠে সেখান থেকে পানি সংগ্রহ করে আনে। চৈত-বৈশাখ মাসে গ্রামের প্রায় সব পুকুরের পানি শুকায়ে যায়। গোসল কিংবা থালা-বাসন ধোয়ার মতো পানি থাকে না পুকুরে।'
শিয়ালডাঙ্গা গ্রামের বাসিন্দা জব্বার মণ্ডল বলেন, 'পানির জন্য হামাগের খুব কষ্ট। পানির কষ্টের কারণে হামাগের গ্রামে অন্য এলাকার মানুষেরা ছেলে-মেয়েক বিয়া দিতে চায় না।'
শিয়ালডাঙ্গা গ্রামের একটি ফসলি মাঠে গভীর নলকূপের অপারেটর সাইদুল ইসলাম বলেন, 'আমি যে গভীর নলকূপ পরিচালনা করি সেটা ১৯৯২ সালে স্থাপন করা হয়েছিল। প্রথম যখন গভীর নলকূপ স্থাপন করা হয়েছিল তখন ৯০ ফিট নিচে পানি পাওয়া গেছে। ১০-১২ বছর দেখা গেল আর পানি উঠছে না। তখন আবারও বোরিং করে ১১০ ফিট নিচে পানি পাওয়া যায়। চার বছর আরেক দফা বোরিং করা হয়। এখন গভীর নলকূপটাতে ১২৫ ফিট নিচে পানি পাওয়া যায়।'
তিনি বলেন, 'যেভাবে মাটির নিচে পানির স্তর নামছে তাতে মনে হচ্ছে এই গভীর নলকূপে আর ১০-১২ বছর পর পানিই উঠবে না।'
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পোরশা উপজেলার ছাওড় ইউনিয়নের মতো নিতপুর, গাংগুরিয়া ও মশিদপুর ইউনিয়ন, সাপাহার উপজেলার সদর, তিলনা ও গোয়ালা, পত্নীতলা উপজেলার দিবর, শিয়াড়া ও মাটিন্দর এবং নিয়ামতপুর উপজেলার পাড়ইল, রসুলপুর ও হাজিনগর ইউনিয়ন অতিউচ্চ পানি সংকটাপন্ন এলাকার সুপেয় পানির তীব্র সংকটে বাসিন্দাদের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
বরেন্দ্র এলাকায় পানি সংকট মোকাবিলায় দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে স্থানীয় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা বরেন্দ্র উন্নয় সংস্থা (বিডিও)। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক আখতার হোসেন বলেন, 'আমাদের সংস্থা ২০০০ সাল থেকে সুপেয় পানির সংকট মোকাবিলায় নাগরিকদের সহযোগিতাসহ বিভিন্ন ধরনের সামাজিক সুরক্ষা নিয়ে করছে৷ আমরা যখন প্রথম দিকে সরকারি কর্মকর্তাদের বিভিন্ন এলাকায় পানির সংকট নিয়ে বলতাম, তখন তারা আমাদের তেমন পাত্তা দিতো না৷ অনেকে মুখের ওপর বলতো, আমরা বিদেশ থেকে টাকা এনে সেগুলো আত্মসাৎ করার জন্য মিথ্যে পানি সংকটের কথা বলি। এখন সরকারি বলছে বরেন্দ্র এলাকায় পানির সংকট দিন দিন খারাপের দিকে যাচ্ছে। ভূ-গর্ভস্থ পানি ব্যবহারে মিতব্যয়ী হতে নির্দেশনা দিচ্ছে। অথচ এসব পরামর্শ আমরা অনেক আগে থেকে দিয়ে আসছি।'