
বদলগাছী (নওগাঁ) প্রতিনিধি:
নওগাঁর বদলগাছীতে একই খতিয়ানে থাকা মোট জমির ওপর খাজনার নিয়ম পরিবর্তনের দাবিতে মাইকিং করার জন্য হোসাইন মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান টুটুল নামের এক ব্যক্তিকে উঠিয়ে নিয়ে গিয়ে গালিগালাজ ও মারপিট করার অভিযোগ উঠেছে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের বিরুদ্ধে। সেই সাথে সুমন হোসেন নামের এক কর্মচারীও তাকে মারধর করে বলে অভিযোগ আছে। ঘটনা জানাজানি হলে সচেতন মহল ও স্থানীয়দের মাঝে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
গত বুধবার (০১ এপ্রিল) বিকাল সাড়ে ৫ টায় উপজেলা ভূমি অফিসে এ ঘটনা ঘটে। একই খতিয়ানে অসংখ্য দাগ নং এ থাকা সকল জমির ওপর খাজনা না দিতে জনগণকে সচেতন করার জন্য তিনি মাইকিং করছিলেন। বিষয়টি জানতে পেরে এসিল্যান্ডের ড্রাইভার সুমন হোসেন তাকে ইউএনও’র রুমে ধরে নিয়ে যায় বলে ভূক্তভোগীর অভিযোগ।
ভূক্তভোগী হোসাইন মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান টুটুল রজনীগন্ধা ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান এবং উপজেলার কোলাহাট এলাকার কয়াভবানীপুর গ্রামের বাসিন্দা।
ভুক্তভোগী ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বুধবার বিকেলে আসাদুজ্জামান টুটুল উপজেলা ভূমি অফিসের সামনে একটি ভ্যানের ওপর মাইকে সর্বসাধারণের উদ্দেশ্য বলতে থাকেন, নিজেরা ইচ্ছা মতো আইন করে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা নিয়ে যাচ্ছেন। তারই প্রতিবাদে রজনীগন্ধা ফাউনন্ডেশন ইউএনও’র কাছে স্বারকলিপি প্রেরণ করবে। স্বারকলিপির বিষয়বস্তু আপনারা জানেন, বাংলাদেশের আইনে যেকোনো জমির একটি খতিয়ান নং থাকে। সেই খতিয়ানে অনেকগুলো দাগ নং থাকে। এবং এই দাগ নম্বরে অনেকগুলো জমির সমিষ্টি থাকে। ধরে নিন ৩০২ নম্বর দাগে ৮২ নং খতিয়ানে আমার পাঁচ কাঠা জমি আছে।
এই পাঁচ কাঠা জমি যেকোনো কারণেই হোক আমি যদি বিক্রি করতে যাই। তাহলে ভূমি অফিস কে ওই ৮২ নম্বর খতিয়ানের সব জমির খাজনা দিতে হবে। যেটা একজন সাধারণ মানুষের কাছে মরার ওপর খাড়ার ঘা। আমি পাঁচ কাঠা জমির মালিক হয়ে কেন সকল জমির খাজনা দিতে যাবো। এটা কোন আইনের বলে কাদের প্ররোচনায় সাধারণ মানুষদের কাছ থেকে মোট খতিয়ানের জমির টাকা আদায় করা হয়। মাইকে এসব কথা বলার সময় তাকে সেখান থেকে তুলে নিয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয়ে নেওয়া হয় এবং তাকে গালিগালাজ ও মারধর করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। মারধরের কারণে অসুস্থ হলে আসাদুজ্জামান টুটুল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নেন।
সাদেকুল ইসলাম উজ্জ্বল নামে প্রত্যক্ষদর্শী এক ব্যক্তি বলেন, ওই বৃদ্ধ লোকটি ভূমি অফিসের সামনে ভ্যানে ওপর মাইক ঝুলিয়ে জমির খাজনার আইন পরিবর্তনের জন্য মাইকিং করছিলো। পরে ভূমি অফিসের লোকজন তাকে ইউএনও অফিসে তুলে নিয়ে যায় ভ্যান মাইকসহ। পরে শুনলাম তাকে গালিগালাজ ও মারধর করা হয়েছে। কোনো বিষয়ে প্রতিবাদ করলেই এরকম পরিস্থিতি সম্মুখীন হতে হবে, আমরা কোন দেশে বাস করছি।
ভুক্তভোগী বৃদ্ধ হোসাইন মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান টুটুল বলেন, “আমার নামে ৫ কাঠা জমি আছে। আমি আমার অংশের খাজনা দিতে চাই। কিন্তু খতিয়ানের মোট ৯ একরের খাজনা না দিলে তারা নেয় না। এর প্রতিবাদ করায় আমাকে তুলে নিয়ে গিয়ে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ ও মারধর করা হয়েছে।”
আসাদুজ্জামান টুটুল বলেন, একটা অন্যায় নিয়মের বিরুদ্ধে নিয়মতান্ত্রিকভাবে প্রতিবাদ করে জনগণকে অবহিত করার জন্য যখন মাইকিং করছিলাম। এবং স্মারকলিপি দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, তখন এসিল্যান্ডের ড্রাইভার তার গাড়িতে জোর করে উঠিয়ে নিয়ে ইউএনও’র রুমে যায়। কুত্তার বাচ্চা ও দালাল বলে ইউএনও ওয়েট পেপার ছুড়ে মারে। এতে তার বুকে লেগে জখম হয়।
একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা যদি ওয়েট পেপার ছুঁড়ে মেরে আহত করেন, আমি হতবাক হই। আমার চোখে লাগলে কি হতো? প্রশ্নের সুরে বলেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, আমরা হতভাগা, কারণ এই রকম রেসপনসিবল ম্যান আমাদের উপজেলার অভিভাবক। একটা মেয়ে মানুষ ভুল করতে পারে, কিন্তু একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তার ভুল মেনে নেওয়া যায়না। এবং ইউএনও’র সাহসেই ড্রাইভার আমাকে ঘুষি মারলে আমি পড়ে যাই। তখন ইউএনও সমবেদনা জানানোর জন্য ড্রাইভারকে মারতে নিষেধ করে।
তবে আমি বলতে চাই জমির খাজনার এই অনিয়ম আমি রোধ করবোই। এর জন্য আমি ভূমি মন্ত্রী ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। বাংলাদেশে এরকম যদি অফিসার থাকে, তাহলে আমরা নিরীহ মানুষ প্রতিদিন নিগৃহিত নিপীড়িত হবো। আমি আশার করবো আপনাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে এই সকল অফিসারকে কি করা যায়, সেটা আপনারা করবেন। এছাড়া জনগণের ভোগান্তির জন্য একই খতিয়ানে অসংখ্য দাগ নং থাকা জমির খাজনা দেওয়ার নিয়ম বাতিল করবেন বলে আমি আশা করি।
ভ্যান চালক মেহেদী বলেন, হঠাৎ আমাদের ধরে নিয়ে যাওয়া হয় অফিসে। এরপর আমাকে সন্ধ্যা পর্যন্ত আটকিয়ে রাখা হয়। পরে ভ্যানসহ আমাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। তবে মাইক দেয়নি। সেটা রেখে দিয়েছে তারা।
জানতে চাইলে এসিল্যান্ডের ড্রাইভার সুমন হোসেন মুঠোফোনে বলেন, আমি তো ড্রাইভার। আমি উঠিয়ে নিয়ে যাইনি। পুলিশ উঠিয়ে দিয়েছে, আমি নিয়ে গিয়েছি। এর বেশি কিছু জানিনা। আর আমার মারার বিষয়টি মিথ্যা।
জানতে চাইলে বদলগাছী থানার অফিসার ইনচার্জ লুৎফর রহমান মুঠোফোনে বলেন, সেখানে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছিল। এসিল্যান্ড স্যারের সাথে ড্রাইভার ও পুলিশ উপস্থিত ছিল। সেখান থেকে তাকে নিয়ে যাওয়া হয়।
জানার জন্য একাধিকবার ফোন দিলেও রিসিভ করেননি উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) পলাশ উদ্দিন।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার ইসরাত জাহান ছনি মারধরের বিষয়টি অস্বীকার করে সংবাদকর্মীকে বলেন,“ তাকে আমার অফিসে ডেকে আনা হয়েছিলো জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য। তিনি কার প্ররোচনায় মাইকিং করছিলো। এই আইন তো ইউএনও বা এসিল্যান্ড তৈরী করেনি। পরে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।”
এদিকে এ ঘটনায় এলাকায় ক্ষোভ বিরাজ করছে। স্থানীয়রা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি খতিয়ানের মোট জমির পরিবর্তে ব্যক্তিগত মালিকানার অংশ অনুযায়ী খাজনা গ্রহণের নিয়ম চালুর দাবি তুলেছেন ভুক্তভোগীসহ স্থানীয়রা।