
বিশেষ প্রতিবেদক
নওগাঁর মান্দা উপজেলা বিএনপির দপ্তর আবুল কালাম আজাদকে নওগাঁ-৪ (মান্দা) আসনের সংসদ সদস্য ইকরামুল বারীর (টিপু) বাসায় তুলে নিয়ে মারধরের অভিযোগ পাওয়া গেছে। গতকাল রোববার বিকেল উপজেলার প্রসাদপুর বাজারের হাসপাতাল রোড এলাকায় সংসদ সদস্যের বাড়িতে আটকে রেখে আবুল কালাম আজাদকে মারধর করা হয়েছে বলে উপজেলা বিএনপির একটি অংশের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়। ওই বিএনপি নেতা বর্তমানে নওগাঁ সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
আজ সোমবার বিকেলে নওগাঁ শহরের মুক্তির মোড় এলাকায় একটি কমিউনিটি সেন্টার মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলন করে এসব তথ্য জানান উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম চৌধুরী বাবুল।
লিখিত বক্তব্যে উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘গত রোববার দুপুরে মান্দা উপজেলা বিএনপির দপ্তর সম্পাদক আবুল কালাম আজদকে উপজেলার প্রসাদপুর বাজারের চৌরাস্তা মোড় এলাকা থেকে এমপির সন্ত্রাসী বাহিনীর প্রধান ও এপিএস মোহাম্মদ আলী এবং গোল্ডেনসহ ১০-১২ জন সন্ত্রাসী তুলে নিয়ে যায়। তাঁরা সেখান থেকে আবুল কালাম আজাদকে পেটাইতে পেটাইতে টানা-হেচড়া করে সেখান থেকে প্রায় ৩০০ মিটার দূরে প্রসাদপুর বাজারের হাসপাতাল রোডে এমপি ইকরামুল বারীর বাসায় নিয়ে যায়। সেখানে নিয়ে যাওয়ার পরে এমপির বাড়ির নিচতলায় টর্চার সেলে তাঁকে আটকে রেখে নির্মমভাবে নির্যাতন ও মারধর করে। মারধরের একপর্যায়ে গুরুত্বর আহত অবস্থায় তাঁকে এমপির বাড়ির সামনে রাস্তায় ফেলে রেখে যায়। পরে সেখানে উপস্থিত বিএনপির অন্যান্য নেতাকর্মী ও স্থানীয় লোকজন তাঁকে উদ্ধার করে নওগাঁ জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করান। বর্তমানে তিনি নওগাঁ সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘দলীয় আধিপত্য বিস্তারের জন্য ভিন্নমত পোষনকারী নেতাকর্মীদের ওপর পরিকল্পিতভাবে ভয়ভীতি প্রদর্শন ও নির্যাতন করছে এমপি ইকরামুল বারীর নির্দেশে সন্ত্রাসী মোহাম্মদ আলী ও গোল্ডেন এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে। এরই অংশ হিসেবে উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক আবুল কালাম আজাদকে তুলে নিয়ে মারধর করা হয়। এর আগে উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক শামসুল ইসলাম বাদল এমপি ইকরামুল বারীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে গেলে তাঁর ওপর হামলা চালিয়ে মারাত্মকভাবে আহত করা হয়। এসব ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি একটি ধারাবাহিক সান্ত্রাসী কার্যক্রমের অংশ। যার মাধ্যমে দলীয় ভিন্নমত দমন এবং ব্যক্তিগত আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে।’
শফিকুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘নির্বাচনে বিজয়ের পরপরই এমপি ইকরামুল বারী দলীয় ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাকর্মীদের সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সঙ্গে প্রকাশ্য ও গোপন আঁতাতে লিপ্ত হয়েছেন। তিনি ত্যাগী ও বিএনপি নেতাকর্মীদের উপর তার নিজস্ব গুন্ডাবাহিনী দ্বারা নির্যাতন চালিয়ে এবং কথিত সরকারের লোকজনকে সঙ্গে নিয়ে সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির রাজত্ব কায়েম করেছেন।’
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে এমপি ইকরামুল বারীর কর্মকা-ের বিচার চেয়ে তিনি বলেন, ‘এমপি ইকরামুল বারীর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সরকারি ও দলীয় সোর্সের মাধ্যমে দ্রুত সময়ের মধ্যে নিরেপক্ষ তদন্ত করতে হবে। তার চাঁদাবাজি দুর্নীতি ও সন্ত্রাসী কর্মকা-ের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। গুরুতর আহত নেতা আবুল কালাম আজাদ ও শামসুল ইসলাম বাদলের উপর হামলার সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের শাস্তি নিশ্চিতের মাধ্যমে মান্দা উপজেলা বিএনপির দলীয় শৃঙ্খলা ও স্বাভাবিক রাজনৈতিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা এখন সময়ের দাবী।’
সংবাদ সম্মেলনে অন্যদের মধ্যে উপজেলা বিএনপির যুগ্ন সাধারণ সম্পাদক বেলাল হোসেন খান, উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট কুমার বিশ্বজিৎ সরকার ও শামসুল ইসলাম বাদল, উপজেলা বিএনপির কোষাধ্যক্ষ গোলাম মোস্তফা, ভারশোঁ ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি গোলাম নবী বকুল প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
নওগাঁ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আহত বিএনপি নেতা আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘গতকাল রোববার বিকেলে প্রসাদপুর বাজারে বিএনপির পার্টি অফিসে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বের হই। যাওয়ার পথে প্রসাদপুর চৌরাস্তায় পৌঁছালে মোহাম্মদ আলী ও গোল্ডেনসহ ১০-১২ জন লোক আমাকে মারধর করতে শুরু করে। তাঁরা একপর্যায়ে টেনে-হেঁচড়ে আমাকে সেখান থেকে এমপির বাড়িতে নিয়ে যায়। এমপির বাড়ির নিচতলায় নিয়ে গিয়ে তাঁরা আমাকে মারধর করে। মারধর করতে করতে মোহাম্মদ আলী বলে, ‘তোকে যদি মান্দা উপজেলার বিএনপি কমিটির লোকজনের সাথে কর্মসূচী পালন করতে দেখি তাহলে তোকে প্রাণে মেরে ফেলবো। এ ঘটনায় আমি মামলা করব এবং জেলা ও কেন্দ্রীয় বিএনপি বরাবর অভিযোগ দায়ের করব।’
মারধরের অভিযোগের বিষয়ে মোহাম্মদ আলী ও গোল্ডেনের মুঠোফোনে কল করা হলে তাঁদের দুজনের নাম্বার বন্ধ পাওয়া যাওয়ায় তাঁদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে অভিযোগের বিষয়ে সংসদ সদস্য ইকরামুল বারী টিপু ‘যে ঘটনার বিষয়ে অভিযোগ করা হয়েছে তাঁর সঙ্গে আমার কোনো যুক্ততা নেই। সংসদ অধিবেশন চলার কারণে বেশ কয়েক দিন ধরে আমি এলাকায় নেই। বলা হচ্ছে আমার এপিএস মারধর করেছে, প্রকৃতপক্ষে আমার কোনো এপিএস কিংবা পিএস নাই। দলীয় কোনো নেতাকর্মীদের কলহ হলে এ ঘটনার বিচার করবে উপজলো কিংবা জেলা বিএনপি। এছাড়া মারামারির ঘটনা প্রকৃতপক্ষে ঘটে থাকলে থানায় মামলা করলে পুলিশ আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে। এতে যেই অপরাধী হোক না কেন তাঁকে শাস্তি পেতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘উপজেলা বিএনপির একটি অংশ নির্বাচনের আগে থেকেই আমার বিরুদ্ধে অনেক অপপ্রচার চালিয়েছে। এখনও ওই পক্ষ সক্রিয় রয়েছে। আশা করি, তাঁদের কোনো চক্রান্ত সফল হবে না।’
এ বিষয়ে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মামুনুর রহমান রিপন বলেন, ‘গতকাল ঘটনাটি ঘটার পর একটি পক্ষ বিষয়টি আমাকে জানিয়েছে। এরপর আমিই আহত বিএনপি নেতাকে নওগাঁ জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য সার্বিক সহযোগিতা করেছি। যেহেতু দলীয় কর্মীকে মারধর করা হয়েছে বিষয়টি তদন্ত করে কেউ দোষী প্রমাণিত হলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’