
ডেস্ক রিপোর্টঃ
নওগাঁ সদর উপজেলায় শতাধিক গ্রাহকের টাকা নিয়ে লাপাত্তা হয়ে গেছেন একটি সমবায় সমিতির কর্মকর্তারা। গ্রাহকেরা আমানতের টাকা ফেরত নিতে এসে দেখেন সমিতির কার্যালয় বন্ধ। তাঁরা মুঠোফোনে প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালকসহ অন্যান্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছেন না।
প্রতিষ্ঠানটির নাম ‘প্রত্যাশা মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি। আমানতের টাকা ফেরত পেতে ও প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক রবিউল ইসলামসহ অন্য কর্মকর্তাদের শাস্তির দাবিতে আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে নওগাঁ সদর উপজেলার ইকরকুড়ি এলাকায় সমিতির কার্যালয়ের সামনে মানববন্ধন করেছেন ভুক্তভোগীরা। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন সহকায়তাকারী সংস্থা নামের একটি সংগঠনের ব্যানারে এ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।
ঘন্টাব্যাপী চলা মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, নওগাঁ সদর উপজেলা চণ্ডিপুর ইউনিয়নের ইকরকুড়ি গ্রামের বাসিন্দা রবিউল ইসলাম ২০০৫ সালে প্রত্যাশা মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি নামের একটি সমবায় সমিতি প্রতিষ্ঠা করেন। ইকরকুড়ি এলাকায় সাইনবোর্ড টাঙিয়ে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম চালানো হত। অন্য প্রতিষ্ঠানের চেয়ে বেশি লভ্যাংশ পাওয়ার আশায় ইকরকুড়ি ও আশপাশের এলাকার লোকজন ওই সমিতিতে টাকা জমা রাখেন। আমানতের বিপরীতে নিয়মিত লভ্যাংশও দেওয়া হচ্ছিলো কিন্তু ২০১৮ সাল থেকে আমানতকারীদের লভ্যাংশের টাকা দেওয়া নিয়ে গড়িমসি শুরু করেন প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক রবিউল ইসলামসহ সমিতির অন্যান্য কর্মকর্তারা। এমন পরিস্থিতিতে সমিতির গ্রাহকেরা তাঁদের আমানতের টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য চাপ দিতে থাকলে সমিতির নির্বাহী পরিচালক রবিউল ইসলাম, পরিচালক শফিকুল ইসলামসহ অন্যান্য কর্মকর্তারা আত্মগোপনে চলে যান। এ অবস্থায় প্রতিষ্ঠানটির শতাধিকর গ্রাহক তাঁদের প্রায় দুই কোটি টাকা ফেরত পাচ্ছেন না।
গ্রাহকেরা উপজেলা প্রশাসন ও থানা পুলিশসহ বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন কিন্তু কোনো প্রতিকার পাননি।
মানববন্ধনে আমেনা বেগম (৬৫) নামের এক ভুক্তভোগী গ্রাহক বলেন, আমার মারা যাওয়ার পর একমাত্র মেয়ের কাছ থেকে ৩ লাখ টাকা নিয়ে ২০১৫ সালে প্রত্যাশা মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটিতে এককালীন আমানত হিসেবে জমা দেন। কিছুদিন লাভের টাকায় সংসার ভালোই চলছিল তাঁর। কিন্তু হঠাৎ করে ২০১৯ সালের দিকে সমিতির কার্যক্রম বন্ধ করে সমিতির নির্বাহী পরিচালক রবিউল ইসলামসহ অন্যান্য কর্মকর্তারা পালিয়ে যান। এরপর থেকে আমানতের টাকা ফেরত পাওয়ার জন্য উপজেলা প্রশাসন, থানা পুলিশসহ বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরেও কোনো কাজ হয়নি।
কান্নাজরিত কন্ঠে আমেনা বেগম বলেন, ‘হামার যা আছলো সব নিয়া গাছে, হামি এখন ভিক্ষা করা খাই। বেটির (মেয়ে) কাছ থাকা টাকা নিয়া রাখিছি কিন্তু অরা পলাইছে। এখন হামি অফিসার আর নেতাগের দ্বারে দ্বারে ঘুরাও কিছু করবার পারোছি না। কুটি গেলে টাকা পামু সেই আশায় বসা আছি। বেটি খবর পাঠায় টাকা কবে দিবে।’
আব্দুর রহমান নামের আরেক ভুক্তভোগী বলেন, ‘২০১৯ সালে সমিতির লোকজন পালিয়ে যাবার অনেকদিন পর সমিতির নির্বাহী পরিচালক রবিউল গ্রাহকদের টাক ফেরত দিতে আশ্বস্ত করেছিল। কিন্তু অনেক বাহানা করেও এখনও টাকা ফেরত দিচ্ছে না। রবিউলের মায়ের কাছে গেলে টাকা দিতে অস্বীকার করে। রবিউল আমাদের দেখলে এড়িয়ে চলে। আমরা টাকা ফেরতের জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরেও কোথাও কোন প্রতিকার পাচ্ছি না।’
বিউটি বেগম নামের আরেক গ্রাহক বলেন, ‘৮ বছর থেকে টাকা পাবার আশায় বসে আছি। শুনেছি রবিউলের নিজের লোকেরা সবাই টাকা ফেরত পাইছে। কিন্তু আমরা টাকা পাচ্ছি না।’
আন্তরর্জাতিক মানবাধিকার আইন সহায়তাকারী সংস্থা নওগাঁ জেলা শাখার উপজেলা সভাপতি মোঃ মাসুদ রানা জুয়েল বলেন, ‘সমিতিটি গ্রাহকদের প্রায় দুই কোটি টাকা নিয়ে পালিয়ে যায়। এরপর থেকে ভুক্তোভুগীরা টাকা না পেয়ে বিভিন্ন জায়গায় গিয়েও টাকা না পেয়ে আমাদের কাছে আসে। আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি কিভাবে গ্রাহকের টাকা উদ্ধার করা যায়। এই চেষ্টার অংশ হিসেবে আজকে এই মানববন্ধনের আয়োজন করা হয়েছে। গ্রাহকদের টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করছি।’