
প্রতিনিধি, বদলগাছী (নওগাঁ)
নওগাঁর বদলগাছী উপজেলার গাবনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বর্ষা এলেই শিক্ষা যেন শুধু শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ থাকে না; শুরু হয় বিদ্যালয়ে পৌঁছানোর সংগ্রাম। হাঁটুসমান পানি পেরিয়ে, কাঁধে স্কুলব্যাগ আর হাতে জুতা নিয়ে প্রতিদিন বিদ্যালয়ে যেতে হয় ১৩২ জন শিক্ষার্থীকে। সামান্য বৃষ্টিতেই বিদ্যালয়ের একমাত্র যাতায়াতের পথ তলিয়ে যাওয়ায় শিশুদের দুর্ভোগ এখন নিত্যদিনের বাস্তবতা।
মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) দুপুরে বিদ্যালয় ছুটির পর দেখা যায়, শিক্ষার্থীরা হাঁটুসমান পানি মাড়িয়ে বাড়ি ফিরছে। কারও পোশাক ভেজা, কারও হাত-পায়ে কাদা। অনেকেই বই-খাতা ভিজে যাওয়ার আশঙ্কায় ব্যাগ মাথার ওপরে তুলে বা কাঁধে ঝুলিয়ে পথ পার হচ্ছে। জুতা হাতে নিয়েই পানির ভেতর দিয়ে হাঁটতে হচ্ছে তাদের।
এটি কোনো দুর্গম হাওর বা বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চল নয়; উপজেলা সদর থেকেও খুব বেশি দূরে নয় বিদ্যালয়টি। অথচ বর্ষা মৌসুমে শিক্ষার্থীদের নিরাপদে বিদ্যালয়ে যাতায়াতের ন্যূনতম ব্যবস্থাও নেই।
শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের অভিযোগ, বছরের পর বছর একই দুর্ভোগ চললেও স্থায়ী সমাধানে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। প্রতিদিন পানি পেরিয়ে যাতায়াত করতে গিয়ে বই-খাতা ও পোশাক নষ্ট হচ্ছে। পাশাপাশি পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। ছোট শিশুদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বিগ্ন অভিভাবকরা।
বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও স্থানীয়রা জানান, কয়েক বছর ধরে বিদ্যালয়সংলগ্ন এলাকায় কার্যকর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা না থাকায় সামান্য বৃষ্টিতেই সড়কে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। শুধু যাতায়াতের পথই নয়, বিদ্যালয়ের পুকুরসংলগ্ন একটি ভবনও ঝুঁকির মুখে রয়েছে। সময়মতো সংস্কার না হলে ভবনটি ধসে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা তাদের।
স্থানীয়দের দাবি, জনপ্রতিনিধি, উপজেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরে একাধিকবার বিষয়টি জানানো হলেও এখনো দৃশ্যমান কোনো সমাধান মেলেনি। অথচ এই পথ শুধু বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকই নয়, আশপাশের কয়েকটি গ্রামের মানুষও ব্যবহার করেন।
গাবনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আবুল কালাম আজাদ বলেন, প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে আসছে। কিন্তু তাদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। একটি বিদ্যালয়ে যেতে যদি প্রতিদিন হাঁটুসমান পানি পেরোতে হয়, তাহলে সেটি শুধু একটি গ্রামের সমস্যা নয়, শিক্ষা অবকাঠামোর দুর্বলতার প্রতিচ্ছবি।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আমিরুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি সরেজমিনে পরিদর্শন করেছি। শিশুরা খুব কষ্ট করছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। উপজেলার ৩৪টি বিদ্যালয়ের নতুন রাস্তা নির্মাণের চাহিদাপত্র ইউএনও কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। দ্রুত কাজ শুরু হবে বলে আশা করছি।
বদলগাছী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইসরাত জাহান ছনি বলেন, উপজেলায় অন্তত ৩৪টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের যাতায়াত ব্যবস্থায় সমস্যা রয়েছে। গাবনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বিষয়টিও আমাদের নজরে এসেছে। জলাবদ্ধতা নিরসনে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে গাবনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১৩২ শিক্ষার্থী, তাদের অভিভাবক ও শিক্ষকদের প্রত্যাশা একটাই—আশ্বাস নয়, দ্রুত রাস্তা সংস্কার ও স্থায়ী পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হোক, যাতে শিশুদের শিক্ষার পথে আর জলাবদ্ধতা বাধা হয়ে না দাঁড়ায়।