
আরিফুল ইসলাম রনক, নওগাঁঃ
নওগাঁর রজাকপুর টেক্সটাইল ভোকেশনাল ইনস্টিটিউটের সুপারিনটেন্ডেন্ট কাজী মোস্তাফিজুর রহমানের বিরুদ্ধে সহকর্মীকে মারধর, শিক্ষক-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের হয়রানি এবং শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত করার অভিযোগ তুলে তাঁর পদত্যাগের দাবিতে মানববন্ধন করেছেন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। মানববন্ধনে অংশ নেওয়া শিক্ষক-কর্মচারীরাও সুপারিনটেন্ডেন্টের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের হয়রানির অভিযোগ করেন।
বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে নওগাঁ শহরের রজাকপুর এলাকায় অবস্থিত টেক্সটাইল ভোকেশনাল ইনস্টিটিউটের ক্যাম্পাসে এ মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষক ও কর্মচারীরা বিভিন্ন স্লোগান দিয়ে সুপারিনটেন্ডেন্টের বিরুদ্ধে অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।
মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারীদের অভিযোগ, সুপারিনটেন্ডেন্ট কাজী মোস্তাফিজুর রহমান প্রায় ১২ বছর ধরে প্রতিষ্ঠানটিতে কর্মরত রয়েছেন। তাঁর দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট হয়েছে এবং শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কমতে শুরু করেছে বলে অভিযোগ করেন তারা।
তাদের দাবি, প্রায়ই ক্লাস চলাকালে বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষকদের দীর্ঘ সময় বৈঠকে বসিয়ে রাখা হয়। এতে নির্ধারিত সময়ে পাঠদান ব্যাহত হয় এবং শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ ছাড়া তাঁর সিদ্ধান্ত বা কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কোনো শিক্ষক, কর্মচারী কিংবা শিক্ষার্থী কথা বললে তাদের বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি প্রদর্শন ও হয়রানি করা হয় বলেও মানববন্ধনে অভিযোগ করা হয়।
সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানের টেকনিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট মো. নুরুন্নবীর সঙ্গে সুপারিনটেন্ডেন্টের বিরোধ প্রকাশ্যে আসে। অভিযোগ রয়েছে, গত ২৫ আগস্ট সকাল ৯টার দিকে নুরুন্নবী প্রতিষ্ঠানে গিয়ে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করতে থাকলে সুপারিনটেন্ডেন্ট কাজী মোস্তাফিজুর রহমান পেছন থেকে এসে তাঁকে কিল মারেন। পরে হাজিরা খাতা কেড়ে নেওয়া এবং তাঁর হাত মুচড়ে ধরার অভিযোগও করেন নুরুন্নবী।
নুরুন্নবীর ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার সময় তাঁকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করা হয় এবং একটি সাদা কাগজে স্বাক্ষর করতে চাপ দেওয়া হয়। এতে তিনি রাজি না হওয়ায় আবারও তাঁর ওপর হামলা চালানো হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। পরে আহত অবস্থায় তিনি নওগাঁ সদর হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। চিকিৎসা শেষে ২৬ আগস্ট তিনি বাড়িতে ফেরেন।
মো. নুরুন্নবী বলেন, “সুপারিনটেন্ডেন্টের কথা না শোনায় তিনি প্রায় ছয় মাসের বেশি সময় ধরে আমাকে বিভিন্নভাবে হয়রানি করছেন। তিনি প্রতিষ্ঠানে যোগদানের পর থেকেই পরিবেশ নষ্ট হয়ে গেছে। ঘটনার দিন তিনি আমার ওপর হামলা করেন এবং সাদা কাগজে স্বাক্ষর করতে চাপ দেন। আমি স্বাক্ষর করতে রাজি না হওয়ায় আমাকে গালিগালাজ ও মারধর করা হয়। আমি এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই।”
মানববন্ধনে অংশ নেওয়া দশম শ্রেণির এক ছাত্রী অভিযোগ করে বলেন, সুপারিনটেন্ডেন্টের কথা না শুনলে তিনি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে খারাপ ভাষায় কথা বলেন এবং বিভিন্নভাবে হুমকি দেন। তিনি বলেন, “নুরুন্নবী স্যারের ওপর যে হামলা হয়েছে, তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়ার মতো নয়। আমরা এর সুষ্ঠু বিচার চাই।”
প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী তামিম বলেন, “আমাদের সঙ্গে অন্যায় হলেও একজন শিক্ষক হয়ে আরেকজন শিক্ষকের গায়ে হাত তোলা কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি আমাদের প্রধান। তাঁর কাছ থেকে আমরা কী শিখব? একজন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানের আচরণ এমন হওয়া উচিত নয়।”
প্রতিষ্ঠানের টেকনিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট আব্দুর রহমান অভিযোগ করেন, সুপারিনটেন্ডেন্ট দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে শিক্ষক ও কর্মচারীদের বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হচ্ছে। তিনি বলেন, “আমরা দীর্ঘদিন ধরে নানা সমস্যার মধ্যে কাজ করছি। সাম্প্রতিক ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। একজন সহকর্মীর ওপর হামলার অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।”
প্রতিষ্ঠানের মেকানিক্স বিভাগের কর্মচারী মোদাচ্ছের আলী বলেন, সুপারিনটেন্ডেন্টের বিরুদ্ধে কোনো কথা বললে বা তাঁর সিদ্ধান্তের সমালোচনা করলে নানা ধরনের হয়রানির শিকার হতে হয়। এ কারণে অনেকেই ভয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতে চান না বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
মানববন্ধনে অংশ নেওয়া অভিভাবকরা বলেন, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-কর্মচারীদের মধ্যে এমন উত্তেজনাকর পরিস্থিতি এবং বিরোধ শিক্ষার্থীদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তারা প্রতিষ্ঠানে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ফিরিয়ে আনার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে রজাকপুর টেক্সটাইল ভোকেশনাল ইনস্টিটিউটের সুপারিনটেন্ডেন্ট কাজী মোস্তাফিজুর রহমান মারধরের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ঘটনার দিন তাদের মধ্যে কোনো মারামারি হয়নি। হাজিরা খাতা নিয়ে কিছুটা টানাটানির ঘটনা ঘটেছিল এবং এতে তাঁর হাতেও আঘাত লাগে।
তিনি বলেন, “সেদিনের বিষয়টি মারামারি নয়, একটু খাতা টানাটানি হয়েছে। আমার হাতেও লেগেছে। ঘটনার পর আমি দুঃখ প্রকাশ করেছি। তবে নুরুন্নবী যে অভিযোগগুলো করছেন, তার সবগুলো সত্য নয়।”
তবে মানববন্ধনে অংশ নেওয়া শিক্ষক-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীরা সুপারিনটেন্ডেন্টের বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করে অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানান। তাদের দাবি, শুধু দুঃখ প্রকাশ করলেই ঘটনার সমাধান হবে না। প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘদিনের নানা অভিযোগ খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
মানববন্ধনকারীরা দ্রুত সুপারিনটেন্ডেন্ট কাজী মোস্তাফিজুর রহমানের পদত্যাগ অথবা তাঁকে অপসারণের দাবি জানান। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখা, শিক্ষক-কর্মচারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেন তারা।