
ডেস্ক রিপোর্টঃ
জন্ম থেকেই চোখে আলো নেই। তবে জীবনের স্বপ্ন দেখতে চোখের আলো লাগে না—তা যেন নিজের জীবন দিয়ে প্রমাণ করেছেন নওগাঁ সদর উপজেলার হরিহরপুর গ্রামের মো. শাকিল। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধকতা তাঁর পথ আটকে দিতে পারেনি। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন। একের পর এক বাধা পেরিয়ে উচ্চশিক্ষার দরজায় পৌঁছেছেন। কিন্তু শিক্ষাজীবন শেষে সামনে দাঁড়িয়েছিল আরেক কঠিন বাস্তবতা—কর্মসংস্থান।
চাকরি যেন তাঁর কাছে শুধু একটি উপার্জনের পথ ছিল না; ছিল নিজের পায়ে দাঁড়ানোর, পরিবারকে একটু স্বস্তি দেওয়ার এবং সমাজে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষের সক্ষমতার একটি উদাহরণ হয়ে ওঠার স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন পূরণের পথেই এবার নতুন দরজা খুলেছে শাকিলের সামনে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি পেয়েছেন তিনি।
উচ্চশিক্ষা অর্জনের পরেও শাকিলের চাকরি না পাওয়ার বিষয়টি দৃষ্টিগোচর হয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে গতকাল মঙ্গলবার রাতে ঢাকার গুলশান কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংক্ষিপ্ত অনুষ্ঠানে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী শাকিলের হাতে নিয়োগপত্র তুলে দেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষিবিষয়ক প্রকল্পে সেকশন অফিসার হিসেবে তাঁর হাতে নিয়োগপত্র তুলে দেওয়া হয়। মুহূর্তটি শাকিলের দীর্ঘ সংগ্রামের পথে যেন এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে।
শাকিলের বাড়ি নওগাঁ সদর উপজেলার বক্তারপুর ইউনিয়নের হরিহরপুর গ্রামে। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধকতার কারণে ছোটবেলা থেকেই তাঁকে নানা সীমাবদ্ধতার সঙ্গে লড়াই করতে হয়েছে। যেখানে অনেকের জন্য স্বাভাবিক জীবনযাপনই সহজ, সেখানে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়াটাই ছিল তাঁর জন্য বড় এক সংগ্রাম। তবু থেমে যাননি তিনি।
নওগাঁর সদর উপজেলার মুরাদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বদলগাছীর বালুভরা উচ্চবিদ্যালয় এবং বদলগাছী সরকারি কলেজ থেকে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পড়াশোনা শেষ করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সামাজিক বিজ্ঞান বিভাগ থেকে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করেন শাকিল। শাকিলের উচ্চশিক্ষা অর্জনের পথে তাঁর ছোট ভাই সাব্বির ও বন্ধু গৌতম শ্রুতি লেখক হিসেবে সহযোগিতা করেছে।
শাকিল জানান, লেখাপড়া শেষ করে বিভিন্ন চাকরির পরীক্ষায় লিখিত পাশ করলেও ভাইভা বোর্ডে গিয়ে আমি অন্ধ হওয়ার কারণে কোথাও তাঁকে চাকরিতে নেওয়া হচ্ছিল না। এজন্য তিনি হতাশ হয়ে পড়েন। সম্প্রতি নিজের শিক্ষাজীবন ও জীবনের নানা সংগ্রামের কথা নওগাঁ-৫ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য জাহিদুল ইসলামের কাছে তুলে ধরেন শাকিল। তাঁর কথা শুনে অনুপ্রাণিত হন সংসদ সদস্য। শাকিলের মেধা, অধ্যবসায় ও কর্মসংস্থানের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় নিয়ে তাঁর জন্য একটি সুযোগ তৈরির উদ্যোগ নেন তিনি। এরপর বিষয়টি নিয়ে তিনি সরাসরি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে যান। একজন সাধারণ পরিবারের মেধাবী দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী তরুণের জীবনের লড়াই ও কর্মসংস্থানের আকাঙ্ক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখার উদ্যোগ নেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি পাওয়ার পর অনুভূতি জানতে চাইলে শাকিল বলেন, ‘আমি অনেক খুশি। নবম গ্রেডের একটা চাকরি আমার কাছে স্বপ্ন। আমার মতো মানুষের জন্য অনেক বড় পাওয়া। এজন্য আমি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও নওগাঁ সদর আসনের সংসদ সদস্য জাহিদুল ইসলামের প্রতি অনেক কৃতজ্ঞ। উনারা পাশে না দাঁড়ালে আমার হয়তো এতো ভালো চাকরি হতো না।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নওগাঁ সদর আসনের সংসদ সদস্য জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা জনপ্রতিনিধিরা মানুষের জন্য কাজ করি। মানুষের উপকার করতেই আমাদের আনন্দ। শাকিলের বিষয়টি জানার পর আমি নিজেই হয়তো নওগাঁতে ছোটখাটো ওর জন্য ছোটখাটো একটা চাকরির ব্যবস্থা করতে পারতাম। কিন্তু ওর যে যোগ্যতা এবং মেধা সে অনুযায়ী চাকরির ব্যবস্থা করতে পারতাম না। তাই আমি তাঁকে আমাদের মানবিক প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে নিয়ে গিয়েছে। আমার বিশ্বাস ছিলে প্রধানমন্ত্রী তাঁর সম্পর্কে জানার পর একটা চাকরির ব্যবস্থা করবেন। প্রধানমন্ত্রী কাছে ওকে নিয়ে যাওয়ার সাতদিনের মধ্যেই ওর চাকরির ব্যবস্থা হয়ে গেছে। নিজের এলাকার এ রকম সংগ্রামী একটা ছেলের এরকম অর্জনে আমি অনেক খুশি।’