
নিয়ামতপুর (নওগাঁ) প্রতিনিধি
নওগাঁর নিয়ামতপুরে চলতি বছরের জানুয়ারী থেকে শুরু করে আগষ্ট মাস পর্যন্ত এ আট মাসে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন অন্ততঃ ২০০ জন। এদের মধ্যে ১৯৪ জনই কীটনাশক পান করে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন। কীটনাশক পান করার পর এদের প্রত্যেকের স্বজন ও পাড়া—প্রতিবেশীরা গুরুতর অসুস্থ্য অবস্থায় তাদের নিয়ামতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২৯ জনের মৃত্যু হয় স্বাস্থ্যকমপ্লেক্সে। বাকিরা সুস্থ্যতা পেয়ে ফিরে যান পরিবারে। এমনটাই তথ্য জানা গেছে নিয়ামতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সুূত্রে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, নিয়ামতপুর কৃষিপ্রধান এলাকা হওয়ায় এখানে কীটনাশকের প্রাপ্যতা সহজলভ্য। দোকানে চাইলে সহজেই কীটনাশক পাওয়া যায়। কিনতেও কোন বাধা নেই। এ কারনে প্রায়শঃ কোন ধরনের পারিবারিক ঝগড়া—ঝাটি, মনোমালিণ্য, মারামারি, হতাশা, দুঃখ বা অভিমানের ঘটনায় উত্তেজিত হয়ে তাৎক্ষণিক হাতের নাগালে থাকা কীটনাশক পান করে ফেলেন। আর কীটনাশক পানে মৃত্যুর ঘটনাও আশঙ্কাজনক হােও দিন দিন বাড়ছে।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত কীটনাশক পান, গলায় ফাঁসসহ বিভিন্ন উপায়ে আত্মহত্যার চেষ্টার পর চিকিৎসা নিয়েছেন ২০০ জন। আত্মহত্যার চেষ্টাকারী ব্যক্তিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বয়ঃসন্ধিকালের তরুণ—তরুণী ও ক্ষুদ্র নৃ—গোষ্ঠীর মানুষ রয়েছেন। তাঁদের বেশির ভাগের বয়স ১৫ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে।
আত্নহত্যার চেষ্টায় মাসভিত্তিক হিসাব অনুযায়ি জানুয়ারিতে ১০ জন, ফেব্রুুয়াারিতে ১৭, মার্চে ২৮, এপ্রিলে ৩১, মে মাসে ২৯, জুনে ৩২, জুলাইয়ে ২৪ এবং আগষ্ট মাসে ২৯ জন। এরা সকলেই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিয়েছেন।
আত্নহত্যার প্রবনতায় স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, অতিরিক্ত আবেগপ্রবণতা, সহিষ্ণুতার অভাব, সাংসারিক মনোমালিন্য, মানসিক চাপ, হতাশা, মুঠোফোন ও ডিজিটাল পর্দায় অতিরিক্ত আসক্তি, পারিবারিক কলহ, অপরিণত প্রেমের সম্পর্ক, বেকারত্ব ও অর্থনৈতিক সংকটের কারণে এমন ঘটনা ঘটছে বলে মন্তব্য করছেন।
উপজেলা সদর ইউনিয়নের ২০ বছর বয়সী এক যুবক কীটনাশক পান করে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন। নেহায়েত ভাগ্যে বেঁচে ফিরে তিনি বলেন, ‘পারিবারিক কলহ থেকে মুক্তি পেতে আমি আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলাম।’
একই ইউনিয়নের এক গৃহবধূ বলেন, ‘অল্প বয়সে বিয়ের পর থেকেই স্বামীর সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে ঝগড়াঝাটি লেগেই থাকত। সেই যন্ত্রণা থেকে বাঁচতে আত্মহত্যার মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছিলাম।’
এছাড়াও আনত্নহত্যার চাঞ্চল্যকর ঘটনায় গত ২২ জুলাই উপজেলার পাঁড়ইল ইউনিয়নের পশ্চিম মীরাপাড়া এলাকায় স্বামীর ওপর অভিমান করে দেড় বছরের একমাত্র সন্তানকে কীটনাশক পানে হত্যার পর এক মা নিজে আত্মহত্যার চেষ্টায় কীটনাশক পান করেন। পরবর্তীতে তাকে (মা) গুরুতর অসুস্থ্য অবস্থায় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করালে সেখানকার চিকিৎসায় তিনি ভাগ্যজোরে বেঁচে যান। ওই মা বলেন, ‘একমাত্র সন্তানকে বিষ খাইয়ে মেরে নিজেও বিষপান করেছি। চরম অশান্তি থেকে বাঁচতেই এমন কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম।
এমন ঘটনায় উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ ফয়সাল নাহিদ বলেন, ‘দিন দিন মানুষের ধৈর্যশক্তি, সহ্যশক্তি কমে আসছে। ছোট ছোট বিষয়কে কেন্দ্র করে আত্মহত্যার মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে পিছ পা হচ্ছেন না তাঁরা। জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ১৯৪ জন কীটনাশক পান করে হাসপাতালে ভর্তি হয়। চিকিৎসা শেষে তারা বাড়িতে ফিরেছেন।’ সরকারি উদ্যোগে জনসচেতনতা বাড়ানোর মাধ্যমে এমন আবেগিক ঘটনা রোধ করা যেতে পােও বলে মন্তব্য করেন তিনি।
নিয়ামতপুর সরকারি কলেজের মনোবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক ওবাইদুল হক চৌধুরী বলেন, ‘স্মার্টফোনের অপব্যবহার, মাদকাসক্তি, নৈতিক শিক্ষার অভাব, মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে অজ্ঞতাসহ বিভিন্ন কারণে স্কুল—কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার চেষ্টার প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে এবং দিন দিন তা বাড়ছে উদ্বেগজনকহারে। সামাজিক অস্থিরতা ও বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্ত হতেও অনেক তরুণ আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছেন।’ তিনি বলেন, এমন প্রবণতা প্রতিরোধে অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে, বাড়াতে হবে পারিবারিক বন্ধন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুর্শিদা খাতুন ঘটনার ভয়াাবহতা লক্ষ্য করে বলেন, ‘নিয়ামতপুরে উদ্বেগজনক হারে আত্মহত্যার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে এবং বাড়ছে দিন দিন। এর প্রভাব কমানোর জন্য পারিবারিক শিক্ষা ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির প্রয়োজন মনে করেন তিনি। তাই এমন মরনব্যধি বিষয় প্রতিরোধে সকলকে এগিয়ে আসার আহবান জানান।