
ডেস্ক রিপোর্টঃ
বরেন্দ্র অঞ্চলের তীব্র পানিসংকট ও শুষ্ক জলবায়ুর মধ্যেও আধুনিক সেচ প্রযুক্তি ব্যবহার করে ড্রাগন ফল চাষে সাফল্যের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলার কৃষক মো. আব্দুর রাশেদ। তিনি তার ‘রাশেদ এগ্রো’ খামারে আড়াই বিঘা জমিতে ড্রিপ ও স্প্রিংকলার সেচ প্রযুক্তির সমন্বিত ব্যবহারে সেচের পানি সাশ্রয় হচ্ছে প্রায় ৭০ শতাংশ। পানি সাশ্রয়ের পাশাপাশি ফলের গুণগত মান উন্নয়ন ও উৎপাদন ব্যয় কমাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে এ প্রযুক্তি। পিকেএসএফের সহযোগিতায় ঘাসফুলের ‘স্মার্ট (ফল)’ প্রকল্পের আওতায় খামারটিতে পানি সাশ্রয়ী আধুনিক সেচব্যবস্থা বাস্তবায়ন করা হয়েছে। বরেন্দ্র অঞ্চলের প্রতিকূল কৃষি পরিবেশে এ উদ্যোগ স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে সম্ভাবনাময় ও লাভজনক ফসল চাষের নতুন আশা জাগাচ্ছে।

বরেন্দ্র অঞ্চলে বৃষ্টিপাত তুলনামূলক কম। দীর্ঘদিনের শুষ্কতা, মাটির আর্দ্রতার ঘাটতি ও ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় কৃষিকাজ দিন দিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে ড্রাগন ফল চাষ সম্ভাবনাময় বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ক্যাকটাস জাতীয় উদ্ভিদ হওয়ায় ড্রাগন ফলের গাছ তুলনামূলক খরাসহনশীল। তবে ফুল ফোটা ও ফল ধরার সময় প্রয়োজনীয় আর্দ্রতা নিশ্চিত করা জরুরি। অতিরিক্ত পানি জমে থাকলে শিকড় পচা ও ছত্রাকজনিত রোগের ঝুঁকি বাড়ে। অন্যদিকে পানির অভাবে ফলের আকার ছোট হয়ে যেতে পারে এবং ফলন কমে যায়।
এ সমস্যা মোকাবিলায় রাশেদ এগ্রোতে ব্যবহার করা হচ্ছে ড্রিপ ও স্প্রিংকলার সেচের সমন্বিত পদ্ধতি। ড্রিপ সেচের মাধ্যমে গাছের গোড়ায় সরাসরি পরিমিত পানি সরবরাহ করা হয়। এতে পানির অপচয় কমে, বাস্পীভবন হ্রাস পায় এবং শিকড়ের চারপাশে অতিরিক্ত পানি জমার ঝুঁকি কমে। পাশাপাশি পানির সঙ্গে দ্রবণীয় সার প্রয়োগের সুযোগ থাকায় গাছের পুষ্টি ব্যবস্থাপনাও সহজ হয়। ফলে ফলের আকার, রং ও মিষ্টতা উন্নত করার সম্ভাবনা তৈরি হয়।
কৃষক মো. আব্দুর রাশেদ বলেন, পিকেএসএফের সহযোগিতায় ঘাসফুলের ‘স্মার্ট-(ফল)’ প্রকল্পের আওতায় স্প্রিংকলার সেচের মাধ্যমে জমিতে তুলনামূলকভাবে সমানভাবে পানি ছিটানো যায়। বরেন্দ্র অঞ্চলের তীব্র রোদে ড্রাগন ফলের গাছের কান্ড ও ফলে সূর্যতাপে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। প্রয়োজন অনুযায়ী সেচ ব্যবস্থাপনা গাছের পানির ঘাটতি কমাতে এবং তাপজনিত ক্ষতি নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে। তিনি আরো বলেন ড্রিপ ও স্প্রিংকলার সেচের সমন্বিত ব্যবহারে প্রায় ৭০ শতাংশ সেচের পানি সাশ্রয় হচ্ছে। এ ছাড়া আগাছার বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ, শ্রম ও সময় সাশ্রয় এবং সেচ ব্যবস্থাপনার দক্ষতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। স্বয়ংক্রিয় কন্ট্রোল ইউনিটের মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময় ও পরিমাণে পানি সরবরাহ করা সম্ভব হওয়ায় সেচের ওপর কৃষকের সরাসরি নির্ভরশীলতাও কমছে।
নিয়মতপুর উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ রফিকুল ইসলাম বলেন, রাশেদ এগ্রোর এ উদ্যোগ কেবল একটি খামারে পানি সাশ্রয়ের উদাহরণ নয়; বরং শুষ্ক অঞ্চলে জলবায়ু সহনশীল ও পরিবেশবান্ধব কৃষি সম্প্রসারণের একটি সম্ভাবনাময় মডেল। যথাযথ প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত সহায়তা ও প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে বরেন্দ্র অঞ্চলের আরও কৃষক এ ধরনের আধুনিক সেচপ্রযুক্তি গ্রহণে আগ্রহী হবেন। পানিসংকট মোকাবিলায় পানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো ফলে বরেন্দ্র অঞ্চলে ড্রাগন ফলসহ অন্যান্য উচ্চমূল্যের ফসল চাষের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। এতে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমানোর পাশাপাশি আয় বৃদ্ধি ও কৃষির দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা “ঘাসফুল স্মার্ট প্রকল্প” থেকে আব্দুর রশিদকে সহযোগিতা করা হয়েছে। উপজেলা কৃষি দপ্তর থেকে এই ধরনের উদ্যোগকে আমরা সব সময় উৎসাহ দিয়ে থাকি এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ অব্যহত রয়েছে।