
রংপুর প্রতিনিধি
রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার বালাপাড়া ইউনিয়নের গোপিডাঙ্গা মৌলভীবাজার এলাকায় প্রায় এক দশক আগে নির্মিত একটি সেতু সংযোগ সড়কের অভাবে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। প্রায় ৩৭ লাখ ২৪ হাজার ১৮৩ টাকা ব্যয়ে নির্মিত সেতুটি এখন ব্যবহার করতে হচ্ছে বাঁশ ও কাঠের তৈরি ঝুঁকিপূর্ণ সাঁকো দিয়ে। প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই পথ ব্যবহার করছেন অন্তত ১০ গ্রামের হাজারো মানুষ। দীর্ঘ ১০ বছরেও স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে। সরেজমিনে দেখা যায়, সেতুর দুই পাশের সংযোগ সড়ক ধসে যাওয়ায় স্থানীয়রা নিজ উদ্যোগে বাঁশ ও কাঠ দিয়ে অস্থায়ী সাঁকো তৈরি করেছেন।
সেই নড়বড়ে সাঁকো দিয়েই স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, কৃষক, শ্রমিক, নারী-শিশুসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ প্রতিদিন পারাপার করছেন। সামান্য অসাবধানতায় বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা করছেন এলাকাবাসী। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় সেতুর মূল কাঠামোও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। এক পাশ হেলে গেছে, সংযোগস্থলে সৃষ্টি হয়েছে বড় বড় ফাটল। ধসে যাওয়া অংশে কাঠের পাটাতন বসিয়ে অস্থায়ীভাবে চলাচলের ব্যবস্থা করা হলেও প্রতিদিন ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, ভ্যান, মোটরসাইকেল ও ঘোড়ার গাড়ি চলাচল করায় ঝুঁকি আরও বাড়ছে। ষাটোর্ধ্ব কৃষক বিনয় চন্দ্র বর্মন বলেন, "ভোটের সময় সবাই উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দেন, কিন্তু ভোট শেষ হলে আর কেউ খোঁজ নেন না। ১০ বছর ধরে আমরা দুর্ভোগ পোহাচ্ছি। নতুন সেতু না হলে যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।" জানা গেছে, ২০১৪ সালে ইউএসএআইডি ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ অর্থায়নে, কেয়ার বাংলাদেশের সহযোগিতায় এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)-এর বাস্তবায়নে সেতুটি নির্মাণ করা হয়। কয়েক বছরের মধ্যেই দুই পাশের মাটি ধসে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
এরপর আর স্থায়ীভাবে সংস্কার বা পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়নি। এলাকাবাসীর দাবি, এই সেতু শুধু একটি গ্রামের নয়; অন্তত ১০টি গ্রামের মানুষের প্রধান যোগাযোগ মাধ্যম। কৃষিপণ্য পরিবহন, শিক্ষার্থীদের যাতায়াত এবং স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সেতুর বর্তমান বেহাল অবস্থায় যোগাযোগ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ আলী বলেন, "প্রতি বর্ষায় সেতুর দুই পাশের মাটি ধসে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। প্রশাসনের কাছে বহুবার আবেদন করেছি, কিন্তু বাস্তবে কোনো পরিবর্তন হয়নি।" স্থানীয় ইউপি সদস্য হাফিজার রহমান জানান, বিষয়টি একাধিকবার সংশ্লিষ্ট দপ্তরে জানানো হলেও ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষে এত বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।
বালাপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আনছার আলী বলেন, "গত বছর দুই পাশে মাটি ভরাট করা হয়েছিল। কিন্তু বন্যা ও ভারী বৃষ্টিতে আবার ধসে গেছে। নতুন সেতু নির্মাণই এখন একমাত্র স্থায়ী সমাধান। বিষয়টি প্রকৌশল দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।" কাউনিয়া উপজেলা প্রকৌশলী মো. মনিরুল ইসলাম জানান, ঝুঁকিপূর্ণ সেতুটি পুনর্নির্মাণের জন্য প্রকল্পের অনুমোদন পাওয়া গেছে। ফিজিবিলিটি স্টাডি ও টোপোগ্রাফিক সার্ভে সম্পন্ন হয়েছে এবং বর্তমানে নকশা প্রণয়নের কাজ চলছে। দরপত্র অনুমোদনের পরই নির্মাণকাজ শুরু হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, বছরের পর বছর ধরে শুধু আশ্বাসই মিলছে, বাস্তবে কাজের কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। তাদের দাবি, দ্রুত নতুন সেতু নির্মাণের পাশাপাশি টেকসই সংযোগ সড়ক, নদীভাঙন প্রতিরোধ ব্যবস্থা এবং নির্মাণকাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিরাপদ বিকল্প চলাচলের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হোক। অন্যথায় যেকোনো সময় একটি বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
দীর্ঘ এক দশকের এই দুর্ভোগ স্থানীয়দের কাছে শুধু একটি সেতুর সংকট নয়; এটি গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণের দুর্বলতা এবং উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রিতার একটি স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি।