
গাইবান্ধা সংবাদদাতা
গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার ঐতিহ্যবাহী মেরিরহাট বাজারে সদ্য নির্মাণাধীন একটি মসজিদের জমির মালিকানা নিয়ে ত্রিমুখী বিরোধের সৃষ্টি হয়েছে।
একই জমির ওপর তিনটি ভিন্ন পক্ষ নিজেদের আইনি ও সামাজিক অধিকার ও মালিকানা দাবি করছে।
প্রথম পক্ষ এলাকার ধর্মপ্রাণ সাধারণ মানুষ ও মসজিদ নির্মাণ কমিটি- তাদের দাবি, বিতর্কিত এ জমিটি মূলত একটি ঐতিহাসিক পীরোত্তর সম্পত্তি, যা মুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মীয় কাজে ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত। এরই ধারাবাহিকতায় স্থানীয় ধর্মপ্রাণ মানুষের উদ্যোগে সেখানে একটি বহুতল আধুনিক মসজিদ নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বর্তমানে স্থানটিতে মসজিদ নির্মাণের সাইনবোর্ড টাঙিয়ে মাটি খনন ও প্রাতিষ্ঠানিক কাজ শুরু করা হয়েছে।
দ্বিতীয় পক্ষ পলাশবাড়ী সরকারি খাদ্যগুদাম কর্তৃপক্ষ- তাদের দাবি, মেরিরহাট বাজারের ওই ২০ শতক জমিটি সরকারি সম্পত্তি এবং বর্তমানে তা তাদের নামে বিআরএস (BRS) রেকর্ডভুক্ত। তারা জানান, দীর্ঘ প্রায় বহু বছর ধরে সরকার সেখানে অস্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ করে ধান-চালসহ সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত নানা প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। ফলে এটি সরকারি খাদ্য বিভাগের একচ্ছত্র সম্পত্তি।
তৃতীয় পক্ষ পীরোত্তর সম্পত্তির মোতোয়াল্লীর বংশধর বা ওয়ারিশগণ- তাদের দাবি, জমিটি শতবর্ষী পীরোত্তর সম্পত্তি, যার মূল উৎসর্গকারী ছিলেন পীর সাহেব ওলী মেহের আলী (র.)। তৎকালীন সময়ে সাধারণ মুসলমানদের পক্ষে মুহাম্মদ রণ মামুদ হাজী মোতোয়াল্লী নিযুক্ত হন। যার ধারাবাহিকতায় সিএস (CS) ও এসএ (SA) জরিপে রণ মামুদ হাজী ও তাঁর ওয়ারিশদের নামে আইনগতভাবে জমিটি রেকর্ডভুক্ত হয়।
তারা আরও জানান, দীর্ঘদিন জমিটি ফাঁকা পড়ে থাকার সুবাদে সরকারি খাদ্যগুদাম কর্তৃপক্ষ মৌসুমি কেনাকাটার উদ্দেশ্যে সেখানে সাময়িক ঘর তোলে। পরবর্তী সময়ে বিআরএস জরিপের সময় ভুলবশত বা অসাবধানতাবশত জমিটি সরকারি খাদ্যগুদামের নামে রেকর্ড হয়ে যায়। তবে ওয়াকফ বা পীরোত্তর সম্পত্তি হওয়ায় এটি কোনো ব্যক্তি বা সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব সম্পদ হওয়ার আইনগত সুযোগ নেই। কারণ এটি মহান আল্লাহর নামে উৎসর্গকৃত জনকল্যাণমুখী ধর্মীয় সম্পত্তি, যার মূল উদ্দেশ্যই হলো ধর্মীয় ও মানবসেবামূলক কাজে আঞ্জাম দেওয়া। ভুল রেকর্ড সংশোধনীর জন্য ইতোমধ্যে আদালতে মামলা চলমান রয়েছে।
এ ব্যাপারে মসজিদ নির্মাণ কমিটির সভাপতি বলেন, "এটি শত বছরের পুরোনো পীরোত্তর ধর্মীয় জমি। স্থানীয় মুসলিমদের ইবাদত-বন্দেগির জন্য একটি সুনির্দিষ্ট ও স্থায়ী উপাসনালয়ের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল। সিএস ও এসএ রেকর্ডেও এটি ধর্মীয় সম্পত্তি হিসেবেই নথিভুক্ত রয়েছে। তাই এলাকার ধর্মপ্রাণ সর্বস্তরের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে আমরা আল্লাহর ঘর মসজিদ নির্মাণের কাজ শুরু করেছি। আমরা আশা করি, সরকারি বা সামাজিক কোনো বাধা ছাড়াই এই বরকতময় কাজ সম্পন্ন হবে।"
এদিকে, উপজেলা ভারপ্রাপ্ত খাদ্য নিয়ন্ত্রক- "মেরিরহাট বাজারের সংশ্লিষ্ট ২০ শতক জমিটি সরকারের শতভাগ আইনি প্রক্রিয়ায় বিআরএস (BRS) রেকর্ডভুক্ত সম্পত্তি। খাদ্য বিভাগ দীর্ঘ বছর ধরে সেখানে স্থাপনা তৈরি করে সরকারি খাদ্যশস্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণ কাজ পরিচালনা করে আসছে। হঠাৎ করে সরকারি জমিতে অনধিকার প্রবেশ করে স্থাপনা বা মসজিদ নির্মাণের প্রক্রিয়া চালিয়ে যাওয়া সম্পূর্ণ বেআইনি। আমরা বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছি এবং সরকারি সম্পত্তি রক্ষায় প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।"
অপরদিকে, পীরোত্তর সম্পত্তির মোতোয়াল্লীর ওয়ারিশ পলাশবাড়ী পৌর যুবদলের আহবায়ক আব্দুল লতিফ সরকার বলেন- "আমাদের পূর্বপুরুষ মৃত রণ মামুদ হাজী এই পীরোত্তর সম্পত্তির চিরস্থায়ী মোতোয়াল্লী হিসেবে দায়িত্ব পালন করে গেছেন, যা সিএস ও এসএ খতিয়ানে স্পষ্ট প্রমাণিত। পরবর্তীতে খাদ্য বিভাগ সাময়িকভাবে কেনাকাটার জন্য এটি ব্যবহার করার সুযোগে বিআরএস রেকর্ডে ভুলবশত নিজেদের নাম তোলে। ওয়াকফকৃত পীরোত্তর সম্পত্তি কোনো দিন ব্যক্তিমালিকানাধীন বা সরকারি খাস জমি হতে পারে না এটি সম্পূর্ণ আল্লাহর সম্পত্তি । রেকর্ড সংশোধনের জন্য আমরা আদালতে মামলা দায়ের করেছি। আশা করি, আদালত থেকে ন্যায়বিচার পাব এবং ধর্মীয় কাজের জন্যই জমিটি বহাল থাকবে।"
অতীতের উদাহরণ টেনে তিনি আরো বলেন, "আমার নানা মরহুম রণ মামুদ হাজী মোতোয়াল্লি হিসেবে পীরোত্তর এক একর ৮৫ শতক জমির মধ্য থেকে দানকৃত মোট ৪৭ শতক জমির ওপর মেরিরহাট ফাজিল (ডিগ্রী) মাদ্রাসা, মেরিরহাট উচ্চ বিদ্যালয় ও মেরিরহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হয়।
নানার মৃত্যুর পর আমার মামা আব্দুর রহিম মেরিরহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি চাকুরি থেকে অবসর গ্রহণের পর দাতা সদস্য হিসেবে বিদ্যালয় দুটির সভাপতি হিসেবে আমৃত্যু দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে তার ছেলে শফিকুল ইসলাম দাতা সদস্য হিসেবে বিদ্যালয় দুটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।