
সাগর মিয়া, রংপুর:
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রংপুর–৬ (পীরগঞ্জ) আসনে এক ব্যতিক্রমী রাজনৈতিক ঘটনার জন্ম দিলেন ৫১ বছর বয়সী আলেম ব্যক্তিত্ব মাওলানা মো. নুরুল আমিন। দীর্ঘদিন মসজিদের মিম্বর, ওয়াজ মাহফিল ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাঠদানের মাধ্যমে মানুষের কাছে পরিচিত এই ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব এবার সরাসরি জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।
শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) ভোর রাতে রংপুর জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ এনামুল আহসান বেসরকারিভাবে তাকে বিজয়ী ঘোষণা করেন। ফল ঘোষণার পর পীরগঞ্জের বিভিন্ন ইউনিয়ন, হাট-বাজার ও গ্রামাঞ্চলে সমর্থকদের আনন্দ মিছিল, দোয়া মাহফিল ও মিষ্টি বিতরণ করতে দেখা যায়।
১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থী হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে নির্বাচনে অংশ নেন মাওলানা নুরুল আমিন। তিনি পেয়েছেন ১,২০,১২৮ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির রংপুর জেলা আহ্বায়ক সাইফুল ইসলাম (ধানের শীষ) পেয়েছেন ১,১৭,৭০৩ ভোট। অর্থাৎ মাত্র ২,৪২৫ ভোটের ব্যবধানে জয় পান নুরুল আমিন।
শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ভোট গণনায় উত্তেজনা ছিল তুঙ্গে। কয়েক দফা এগিয়ে-পিছিয়ে থাকার পর চূড়ান্ত গণনায় এগিয়ে গিয়ে বিজয় নিশ্চিত করেন তিনি। স্থানীয় পর্যবেক্ষকদের মতে, গ্রামভিত্তিক ধর্মীয় প্রভাব, ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা এবং দীর্ঘদিনের সামাজিক যোগাযোগ তার বিজয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য মাওলানা মো. নুরুল আমিন পেশায় একজন ইমাম ও খতিব। তিনি পীরগঞ্জ সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার সহকারী অধ্যাপক হিসেবে শিক্ষকতা করছেন বহু বছর ধরে। তিনি বাংলাদেশ মজলিসুল মুফাসসিরিন কেন্দ্রীয় কমিটির জেনারেল সেক্রেটারি এবং দেশজুড়ে পরিচিত ইসলামী বক্তা হিসেবেও পরিচিত। বিভিন্ন জেলা ও বিভাগে ওয়াজ মাহফিলে নিয়মিত বক্তব্য দিয়ে ধর্মীয় অঙ্গনে পরিচিতি অর্জন করেন। পীরগঞ্জ উপজেলার চতরা ইউনিয়নে প্রবাসী আলতাব হোসেনের ব্যক্তিগত অর্থায়নে প্রায় ১৪ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত দৃষ্টিনন্দন আলতাব নগর জামে মসজিদের খতিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো নির্বাচনে জয়ের পরদিনও তিনি স্বাভাবিক নিয়মে ওই মসজিদে ইমামতি করেন। সেখানে হাজার হাজার মুসল্লির ঢল নামে এবং তার জন্য বিশেষ দোয়া অনুষ্ঠিত হয়।
বিজয়ের পর মাওলানা নুরুল আমিন বলেন, ভোটাররা আমাকে ১১ দলের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত করেছেন, কিন্তু এখন আমি শুধু কোনো দলের নই পীরগঞ্জের প্রতিটি মানুষের প্রতিনিধি। সবাইকে সাথে নিয়েই কাজ করতে চাই। তিনি নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ করতে ভূমিকা রাখায় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ধন্যবাদ জানান। আল্লাহর রহমত ছাড়া কিছুই সম্ভব নয়। আল্লাহ আমাদের বিজয় দিয়েছেন। এখন দায়িত্ব হলো মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করা। বিভেদ নয়, উন্নয়নই হবে আমার রাজনীতি।
তিনি আরও বলেন, শহীদ আবু সাঈদের রক্তস্নাত পীরগঞ্জকে শিক্ষায়, নৈতিকতায় ও উন্নয়নে একটি আদর্শ উপজেলায় পরিণত করতে চাই। মাওলানা মো. নুরুল আমিন পীরগঞ্জ পৌরসভার দুরামীতিপুর গ্রামের বাসিন্দা। তার পিতা মাওলানা আজিজুর রহমান ও মাতা আমেনা খাতুন। ১৯৭৪ সালের ১ মার্চ জন্মগ্রহণ করেন তিনি। ছোটবেলা থেকেই ধর্মীয় শিক্ষার পরিবেশে বেড়ে ওঠেন এবং পরে শিক্ষকতা, খুতবা ও সামাজিক কার্যক্রমের মাধ্যমে স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বে পরিণত হন।
পীরগঞ্জে একজন আলেমের সংসদ সদস্য হওয়াকে স্থানীয়রা ব্যতিক্রমী ঘটনা হিসেবে দেখছেন। অনেকের মতে, এটি শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তন নয় সামাজিক মানসিকতারও পরিবর্তনের ইঙ্গিত। বিশ্লেষকদের ধারণা,ব্যক্তিগত সততার ভাবমূর্তি,দীর্ঘদিনের সামাজিক সম্পর্ক,ধর্মীয় প্রভাব,স্থানীয় ইস্যুতে সরাসরি সম্পৃক্ততা, এই চারটি বিষয় তার বিজয়ের মূল কারণ। ধর্মীয় অঙ্গন থেকে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসে মাওলানা মো. নুরুল আমিন পীরগঞ্জে এক নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা করেছেন।