
রংপুর প্রতিনিধি
রংপুরের হারাগাছ পৌর শহরের চরচতুরা গ্রামে রাজমিস্ত্রি আবু বক্কর সিদ্দিককে (৩৫) গলা কেটে ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় এক নারীসহ দুইজনকে আটক করেছে পুলিশ ও পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
ঘটনাস্থল থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত একটি চাইনিজ কুড়ালও উদ্ধার করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে আটক দুজন হলেন—লালমনিরহাট সদর উপজেলার মিলানবাজার বাঁশদহ আশিরভিটা এলাকার নুর ইসলামের ছেলে সাজু মিয়া (২৫) এবং তার স্ত্রী মুন্নি আক্তার (১৯)। আটকের পর তাদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পিবিআই হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।
গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের হারাগাছ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) অশোক চৌহান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেন। নিহত আবু বক্কর সিদ্দিক কাউনিয়া উপজেলার হারাগাছ ইউনিয়নের পল্লীমারী হকেরবাজার এলাকার রাজা মিয়ার ছেলে। তিনি পেশায় রাজমিস্ত্রি ছিলেন এবং তিন সন্তানের জনক। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, নারীঘটিত বিরোধের জের ধরে এ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হতে পারে। তবে হত্যার প্রকৃত কারণ এবং ঘটনায় অন্য কেউ জড়িত আছে কি না, তা তদন্ত শেষে নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা। ওসি অশোক চৌহান জানান, প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, সাজু মিয়ার স্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্কের চেষ্টা নিয়ে আবু বক্কর সিদ্দিকের সঙ্গে বিরোধ তৈরি হয়। বিষয়টি নিয়ে সাজু মিয়া তাকে সতর্কও করেছিলেন বলে পুলিশের দাবি। এরপরও ওই নারীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করায় সাজু ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
পুলিশ জানায়, গত রোববার (২৪ আগস্ট) সন্ধ্যার পর আবু বক্কর সিদ্দিককে অজ্ঞাত পরিচয়ে মোবাইল ফোনে বাড়ি থেকে বের করে আনা হয়। পরে হারাগাছ পৌর শহরের চরচতুরা গ্রামের শেষ সীমানার একটি নির্জন রাস্তায় তাকে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ধারালো অস্ত্র দিয়ে তার মুখ, কপাল ও ঘাড়ে একাধিক আঘাত করার পাশাপাশি গলা কেটে মৃত্যু নিশ্চিত করা হয় বলে পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে। পরে হত্যাকারীরা মরদেহটি রাস্তার ওপর ফেলে পালিয়ে যায়। জাতীয় জরুরি সেবার মাধ্যমে খবর পেয়ে হারাগাছ থানা পুলিশ রাত সাড়ে ১০টার দিকে ঘটনাস্থলে গিয়ে রক্তাক্ত ও ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করে। ঘটনাস্থল থেকেই হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত বলে ধারণা করা একটি চাইনিজ কুড়াল উদ্ধার করা হয়।
মরদেহটি ময়নাতদন্তের জন্য রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। পুলিশ ও স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার দিন সকালে আবু বক্কর সিদ্দিক অন্যের বাড়িতে রাজমিস্ত্রির কাজ শেষে সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরেন। সন্ধ্যার পর থেকে তার মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল আসে। পরে রাতে ফোনে কথা বলতে বলতে তিনি বাড়ি থেকে বের হয়ে যান।
নিহতের স্ত্রী হামিদা বানু কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, রাতে বাইরে না যেতে তিনি স্বামীকে কয়েকবার নিষেধ করেছিলেন। কিন্তু তার কথা উপেক্ষা করে আবু বক্কর সিদ্দিক বাড়ি থেকে বের হন। এরপরই তিনি হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। তিনি বলেন, “আমার তিনটি ছোট সন্তান রয়েছে। এখন তাদের কী হবে, সংসার কীভাবে চলবে?” স্বামীর হত্যাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান তিনি।
সোমবার বিকেলে নিহতের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, পরিবারের সদস্যদের আহাজারিতে পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। উপার্জনক্ষম স্বামীর নৃশংস হত্যার পর বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন স্ত্রী হামিদা বানু। অন্যদিকে একমাত্র ছেলের মৃত্যুর শোকে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন তার মা সাফিয়া খাতুন। নিহতের স্বজন ও প্রতিবেশীরা জানান, আবু বক্কর সিদ্দিক শান্ত স্বভাবের মানুষ ছিলেন। তার হত্যার ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন তারা। স্থানীয় সাবেক ইউপি সদস্য আবু সালাম বলেন, আবু বক্কর সিদ্দিক এলাকার একজন ভালো ছেলে ছিলেন। হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন করে প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি। এদিকে ঘটনার পরপরই তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় পিবিআই ও হারাগাছ থানা পুলিশ অভিযান চালিয়ে সাজু মিয়া ও তার স্ত্রী মুন্নি আক্তারকে আটক করে।
পিবিআই রংপুরের পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান বলেন, আটক দুজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের রহস্য উদ্ঘাটন এবং ঘটনায় আরও কেউ জড়িত আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। জিজ্ঞাসাবাদ ও তদন্ত শেষে বিস্তারিত জানা যাবে। এ ঘটনায় হারাগাছ থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে।