
রংপুর প্রতিনিধি
রংপুরে চোর সন্দেহে গণপিটুনিতে প্রাণহানির ঘটনা উদ্বেগজনক রূপ নিয়েছে। মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে জেলার মিঠাপুকুর ও গঙ্গাচড়া উপজেলায় পৃথক ঘটনায় গণপিটুনিতে প্রাণ হারিয়েছেন তিনজন। এর মধ্যে গতকাল সোমবার ভোরে মিঠাপুকুরে গরু চোর সন্দেহে খালিদ হাসান (৩২) নামে এক যুবক নিহত হয়েছেন। এর আগের দিন রোববার (২৫ অক্টোবর) ভোরে গঙ্গাচড়ায় অটোরিকশা চুরির অভিযোগে গণপিটুনিতে নিহত হন আরও দুজন। পরপর এসব ঘটনায় জনমনে উদ্বেগ ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। সোমবার ভোর সাড়ে ৫টার দিকে মিঠাপুকুর উপজেলার ২ নম্বর রানীপুকুর ইউনিয়নের মাদারপুর (খিয়ারচড়া) গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। নিহত খালিদ হাসান উপজেলার রূপসী গাছুয়াপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। তিনি সাবেক শিক্ষক মাহবুব ইসলামের ছেলে। তাঁর বাবা স্থানীয় মাদারপুর মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করতেন।
স্থানীয় ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, সোমবার ভোরে মাদারপুরের খিয়ারচড়া এলাকায় খালিদ হাসানকে গরু চোর সন্দেহে আটক করেন স্থানীয় কয়েকজন। পরে তাঁকে ঘিরে ধরে মারধর করেন উত্তেজিত লোকজন। এতে গুরুতর আহত হয়ে ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়। খবর পেয়ে মিঠাপুকুর থানা-পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং মরদেহ উদ্ধার করে।
এর ঠিক এক দিন আগে রোববার ভোরে গঙ্গাচড়া উপজেলার বড়বিল ইউনিয়নের বাগপুর দক্ষিণপাড়া এলাকায় অটোরিকশা চুরির অভিযোগে গণপিটুনিতে নিহত হন দুজন। তাঁরা হলেন কচুয়া সরদারপাড়া এলাকার এজারুল ওরফে রেজাউল কানা (৪৫) এবং কোলকোন্দ ইউনিয়নের সাদিকুল ইসলাম (২৫)।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রোববার ভোর ৫টার দিকে ওই এলাকার সোহেল মিয়ার বাড়ি থেকে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চুরি করে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন দুজন। বিষয়টি টের পেয়ে সোহেল মিয়া চিৎকার শুরু করলে আশপাশের লোকজন এগিয়ে আসেন। পরে মসজিদের মাইকে ঘোষণা দেওয়া হলে স্থানীয় লোকজন ঘটনাস্থল থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরের একটি ধানখেত থেকে অটোরিকশাসহ দুজনকে আটক করেন বলে জানা গেছে। এরপর উত্তেজিত জনতা তাঁদের ওপর হামলা চালায়। একপর্যায়ে গণপিটুনিতে ঘটনাস্থলেই দুজনের মৃত্যু হয়।
মিঠাপুকুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রুহুল আমিন জানান, খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে। পরে ময়নাতদন্তের জন্য রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। ওসি আরও জানান, এ ঘটনায় মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। নিহতের পরিবারের সদস্যরা মামলা করার জন্য আসবেন বলে জানিয়েছেন। তাঁদের পক্ষ থেকে মামলা করা হলে তা গ্রহণ করা হবে। পাশাপাশি ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, চুরির অভিযোগ থাকলেও কাউকে মারধর করে হত্যা করার অধিকার কারও নেই। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কারও বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ উঠলে তাঁকে পুলিশের হাতে তুলে দিতে হবে। অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং অপরাধের বিচার করার দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও আদালতের। পরপর দুই দিনে রংপুরের দুটি উপজেলায় গণপিটুনিতে তিনজনের মৃত্যু আবারও আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার ভয়াবহ পরিণতি সামনে এনেছে। অপরাধের অভিযোগ বা সন্দেহের ভিত্তিতে কাউকে পিটিয়ে হত্যা করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এমন ঘটনা প্রতিরোধে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা এবং অপরাধের অভিযোগে আটক ব্যক্তিদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া জরুরি।