
বরেন্দ্রকণ্ঠ নিউজঃ
বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকলেও মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি এবং ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা নতুন উদ্বেগ তৈরি করছে। জ্বালানির বাজারে অস্থিরতা, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অনিশ্চয়তার প্রভাবে ২০২৬ সালে বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি ৪ দশমিক ৭ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)।
আইএমএফের অক্টোবর ২০২৬-এর ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালে বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৩ দশমিক ১ শতাংশ। ২০২৭ সালে তা বেড়ে ৩ দশমিক ৪ শতাংশে পৌঁছানোর পূর্বাভাস রয়েছে। অন্যদিকে, ২০২৭ সালে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি কমে ৪ দশমিক ১ শতাংশে নামতে পারে।
‘রেজিলিয়েন্স আন্ডার স্ট্রেইন, আর্জেন্ট চয়েসেস’ শীর্ষক প্রতিবেদনে সংস্থাটি বিশ্ব অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে বলেছে, একের পর এক সংকটের মধ্যেও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রয়েছে। তবে সব দেশ সমানভাবে এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে পারছে না। প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগের সুবিধা পাওয়া অর্থনীতিগুলো তুলনামূলকভাবে ইতিবাচক অবস্থানে থাকলেও জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলো বাড়তি চাপের মুখে রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে বাড়ছে অর্থনৈতিক ঝুঁকি
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়তে পারে। এর প্রভাব পড়বে শিল্প উৎপাদন, পণ্য পরিবহন, আমদানি ব্যয় ও সরকারি অর্থব্যবস্থায়।
বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহ, মজুত ব্যবহার এবং জ্বালানির দক্ষ ব্যবহার সরবরাহের চাপ সামাল দিতে সহায়তা করছে। একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ কিছু অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধির গতি ধরে রাখতে ভূমিকা রাখছে।
তবে সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে কিংবা জ্বালানি অবকাঠামোয় নতুন করে হামলা হলে পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দিলে পণ্য ও সেবার দামও বাড়তে পারে। এতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা আরও কঠিন হয়ে উঠবে।
আমদানিনির্ভর দেশগুলোতে বাড়তে পারে চাপ
আইএমএফের মূল্যায়ন অনুযায়ী, জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল এবং প্রযুক্তি খাতের প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সীমিতভাবে যুক্ত দেশগুলো বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ধাক্কায় বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।
জ্বালানির আমদানি ব্যয় বাড়লে এসব দেশের বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য ও মুদ্রার বিনিময় হারের ওপর চাপ সৃষ্টি হতে পারে। একই সঙ্গে উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বাড়ার কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
নিম্ন আয়ের দেশগুলোর ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে। খাদ্য ও জ্বালানির দাম বেড়ে গেলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যেতে পারে। অন্যদিকে, সরকারের আর্থিক সক্ষমতা সীমিত থাকলে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়াও কঠিন হয়ে পড়বে।
বাণিজ্য ও সরকারি ঋণেও অনিশ্চয়তা
বিশ্ব অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টির আরেকটি কারণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা। বিভিন্ন দেশের মধ্যে বাণিজ্যবিরোধ, শুল্ক বৃদ্ধি এবং উৎপাদনব্যবস্থায় পরিবর্তন পণ্য সরবরাহ ও বাণিজ্যের প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
এ ছাড়া সরকারি ঋণের ব্যয় বৃদ্ধি, বয়স্ক জনগোষ্ঠীর জন্য বাড়তি ব্যয়, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং জাতীয় নিরাপত্তায় অর্থের চাহিদা বাড়ায় অনেক দেশের বাজেটের ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে। ফলে নতুন কোনো অর্থনৈতিক সংকট দেখা দিলে তা মোকাবিলায় সরকারের হাতে পর্যাপ্ত আর্থিক সুযোগ নাও থাকতে পারে।
জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা, সাইবার আক্রমণ ও চরম আবহাওয়াও সরবরাহব্যবস্থার জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে। এসব কারণে উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বাড়লে বাজারে মূল্যস্ফীতির চাপ দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কী প্রভাব পড়তে পারে
বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি বাড়তি চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। আমদানি ব্যয় বেড়ে গেলে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ সৃষ্টি হওয়ার পাশাপাশি উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয়ও বাড়তে পারে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারদরে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য বজায় রাখা এবং নিম্ন আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা সুরক্ষায় কার্যকর অর্থনৈতিক নীতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
বিশ্ব অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে, প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকলেও তা ঝুঁকিমুক্ত নয়। জ্বালানির বাজার, ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গতিপ্রকৃতির ওপর নির্ভর করবে আগামী দিনের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি।