
বরেন্দ্রকণ্ঠ নিউজঃ
তৈরি পোশাকের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নতুন নতুন পণ্যের রপ্তানি বাড়াতে যুক্তরাজ্যের অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য সুবিধা কাজে লাগানোর উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ। এ জন্য রপ্তানিকারকদের দক্ষতা বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ জোরদার এবং পণ্যের মান ও বাজারের নিয়মকানুন মেনে চলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) রাজধানীর বনানীর শেরাটন হোটেলে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) আয়োজিত ‘বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড গ্লোবাল সোর্সিং ডায়ালগে’ এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন দেশের কূটনৈতিক প্রতিনিধি, বাণিজ্য সংগঠন, ক্রেতা ফোরাম ও বাণিজ্য উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
আলোচনায় যুক্তরাজ্যের ‘ডেভেলপিং কান্ট্রিজ ট্রেডিং স্কিম’ (ডিসিটিএস)-এর সুযোগ কাজে লাগানোর বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায়। ঢাকায় ব্রিটিশ হাইকমিশনের উন্নয়নবিষয়ক কাউন্সেলর ও উপউন্নয়ন পরিচালক মার্টিন ডসন বলেন, বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি খাতগুলো এ স্কিমের আওতায় থাকা বাণিজ্য সুবিধার পূর্ণ ব্যবহার এখনও করতে পারেনি।
তিনি বাংলাদেশি উৎপাদকদের সঙ্গে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সংযোগ বাড়াতে স্থানীয় ক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান ও সোর্সিং এজেন্সিগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেন।
রপ্তানিকারকদের প্রশিক্ষণে যৌথ উদ্যোগ
ডিসিটিএসের সুবিধা সম্পর্কে রপ্তানিকারকদের সচেতন করতে ইপিবি ও ব্রিটিশ হাইকমিশন যৌথভাবে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এর আওতায় শুল্কসুবিধা পাওয়ার যোগ্যতা, প্রয়োজনীয় বিধিবিধান এবং বাজারে প্রবেশের শর্ত পূরণের বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
শুল্কবহির্ভূত বাধা মোকাবিলা এবং যুক্তরাজ্যের বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের প্রবেশ সহজ করতে চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন স্থানে কর্মশালা আয়োজনের পরিকল্পনাও রয়েছে। তৈরি পোশাক খাতের রপ্তানিকারকদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।
ইপিবি চলতি বছর অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত রপ্তানি খাতের সংখ্যা আটটি থেকে বাড়িয়ে ১২টি করেছে। পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবার মতো সেবাখাতকে ভবিষ্যতে অগ্রাধিকার তালিকায় যুক্ত করার সম্ভাবনাও বিবেচনা করা হচ্ছে।
ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ হাসান আরিফ বলেন, শিল্প খাতের চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে রপ্তানি বহুমুখীকরণের উদ্যোগ আরও সম্প্রসারণ করা যেতে পারে।
পাটজাত পণ্যে নতুন বাজারের সম্ভাবনা
তৈরি পোশাকের বাইরে বাংলাদেশের পাট ও পাটজাত পণ্যসহ বিভিন্ন অপ্রচলিত পণ্যের রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ নিয়েও আলোচনা হয়। পরিবেশবান্ধব ও সহজে পচনশীল প্যাকেজিং সামগ্রীর চাহিদা বাড়ায় ইউরোপ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাজারে এসব পণ্যের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
ইন্দোনেশিয়া-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি ইন্দোনেশিয়ার বাজারে পাটের সুতা, পাটের বস্তা, তৈরি পোশাক ও হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ তুলে ধরেন। অনুষ্ঠানে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ইন্দোনেশিয়ায় বাংলাদেশের হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড রপ্তানির পরিমাণ ছিল ২০ লাখ মার্কিন ডলার।
এ ছাড়া সেমিকন্ডাক্টর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও সাইবার নিরাপত্তার মতো উচ্চমূল্যের খাতে রপ্তানি সম্প্রসারণের সম্ভাবনাও আলোচনায় উঠে আসে। স্বাস্থ্যসেবা, বিমান পরিবহন ও আতিথেয়তা শিল্পের মতো সেবাখাতেও বাংলাদেশের সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন আলোচকেরা।
বিদেশি ক্রেতাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বাড়ানোর তাগিদ
আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগকে কার্যকর বাণিজ্যিক চুক্তিতে রূপ দিতে বিদেশি ক্রেতাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের ব্র্যান্ডিং বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন অংশগ্রহণকারীরা।
মোহাম্মদ হাসান আরিফ বিদেশি ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশের উৎপাদন সক্ষমতা তুলে ধরতে স্বল্পদৈর্ঘ্য প্রচারচিত্র, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কনটেন্ট এবং বাণিজ্য মেলার সরাসরি ভিডিও ব্যবহারের পরিকল্পনার কথা জানান।
অনুষ্ঠানে অন্যান্য দেশের বাজারে প্রবেশের সম্ভাবনাও আলোচিত হয়। ব্রাজিল-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির এক প্রতিনিধি জানান, দেশটিতে বাণিজ্য প্রচার কার্যক্রমের ধারাবাহিকতায় আগামী ২২ থেকে ২৫ মার্চ সাও পাওলোতে ‘মেড ইন বাংলাদেশ এক্সপো’ আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ছাড়া ইতালিতে বাংলাদেশের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বাণিজ্য প্রতিনিধিদল পাঠানো, ইউরোপের বাজারে প্রবেশের সম্ভাবনা এবং ‘গ্লোবাল সোর্সিং এক্সপো ঢাকা ২০২৬’-এর প্রচার ও আয়োজন নিয়েও আলোচনা হয়।
বহুমুখীকরণে সমন্বিত উদ্যোগের ওপর জোর
বিশ্লেষণধর্মী আলোচনায় উঠে আসে, বাংলাদেশের রপ্তানি আয় বাড়াতে শুধু শুল্কসুবিধা থাকলেই চলবে না; আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা, ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী পণ্য উৎপাদন, বাজার সম্পর্কে দক্ষতা অর্জন এবং কার্যকর বিপণনও জরুরি।
যুক্তরাজ্যের বাণিজ্য সুবিধা কাজে লাগানোর পাশাপাশি নতুন পণ্য ও সেবাখাতের বিকাশ, বিদেশি ক্রেতাদের সঙ্গে সরাসরি ব্যবসায়িক সম্পর্ক এবং আন্তর্জাতিক প্রচার বাড়াতে পারলে বাংলাদেশের রপ্তানি বাজার আরও বিস্তৃত হতে পারে।
রপ্তানি খাতের বহুমুখীকরণ সফল হলে তৈরি পোশাকের ওপর নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি নতুন শিল্পের বিকাশ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগও বাড়তে পারে। তবে এসব সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ দিতে প্রশিক্ষণ, নীতিগত সহায়তা ও বাজার সম্প্রসারণের উদ্যোগ কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।