
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
সিলিকন ভ্যালির প্রতিষ্ঠিত ক্যারিয়ার ছেড়ে বাংলাদেশে ফিরে এসে উচ্চপ্রযুক্তির সেমিকন্ডাক্টর খাতে নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি করেছেন মোহাম্মদ এনায়েতুর রহমান। যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এএমডিতে কাজের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে দেশে গড়ে তুলেছেন চিপ নকশা প্রতিষ্ঠান ইউএলকাসেমি।
২০০৭ সালে ঢাকায় মাত্র চারজন প্রকৌশলী নিয়ে যাত্রা শুরু করা প্রতিষ্ঠানটি প্রায় দুই দশকে বড় পরিসরের একটি আন্তর্জাতিক সেমিকন্ডাক্টর নকশা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে এখানে ৬০০-এর বেশি নকশা প্রকৌশলী কাজ করছেন। পাশাপাশি চারটি দেশে প্রতিষ্ঠানটির নকশা কেন্দ্র রয়েছে।
এনায়েতুর রহমানের পেশাগত জীবনের বড় একটি সময় কেটেছে যুক্তরাষ্ট্রে। সিলিকন ভ্যালিতে কাজ করার সময় তিনি সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের দ্রুত বিকাশ এবং এশিয়ার ক্রমবর্ধমান সক্ষমতা কাছ থেকে দেখেন। তখনই বাংলাদেশের তরুণ প্রকৌশলীদের নিয়ে বৈশ্বিক প্রযুক্তি খাতে কাজ করার পরিকল্পনা তার মনে তৈরি হয়।
দেশে ফিরে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে শুরু করেন ইউএলকাসেমি। তবে শুরুটা সহজ ছিল না। তখন বাংলাদেশে সেমিকন্ডাক্টর নকশার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল, অবকাঠামো ও আন্তর্জাতিক বাজারে আস্থার ঘাটতি ছিল। এর মধ্যে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাবও সামলাতে হয়েছে প্রতিষ্ঠানটিকে।
শুরুতে চিপের বিন্যাস নকশার কাজ দিয়ে কার্যক্রম শুরু হলেও সময়ের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটি চিপের কাঠামো নির্ধারণ, নকশা যাচাই, ভৌত নকশা ও বিভিন্ন বিশেষায়িত প্রকৌশল সেবায় নিজেদের সক্ষমতা বাড়িয়েছে।
ইউএলকাসেমির তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির ৪০০-এর বেশি ভৌত নকশা সম্পন্ন করার অভিজ্ঞতা রয়েছে। পাশাপাশি ১৫০টি এসআরএএম এবং ৫০টি ওটিপি নকশার কাজও করেছে প্রতিষ্ঠানটি। অ্যানালগ সার্কিট নকশা থেকে শুরু করে চিপের ভৌত বাস্তবায়ন পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে আন্তর্জাতিক গ্রাহকদের সেবা দিচ্ছে তারা।
প্রতিষ্ঠানটির যাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক আসে ২০২১ সালে। ওই বছর ইউএলকাসেমি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ চিপ নির্মাতা টিএসএমসির নকশা কেন্দ্র জোটের অংশীদার হয়। এর ফলে বাংলাদেশের একটি প্রতিষ্ঠান বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর নকশা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে নিজেদের সক্ষমতা তুলে ধরার সুযোগ পায়।
এনায়েতুর রহমানের দৃষ্টিতে, বাংলাদেশের জন্য সরাসরি বড় আকারের চিপ কারখানা স্থাপনের চেয়ে প্রথম ধাপে চিপ নকশা, যাচাই, পরীক্ষা ও প্যাকেজিংয়ের মতো দক্ষতাভিত্তিক খাত গড়ে তোলা বেশি বাস্তবসম্মত। এ জন্য প্রয়োজন দক্ষ প্রকৌশলী এবং আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ।
প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক প্রকৌশলী দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে বের হচ্ছেন। তাদের মধ্যে একটি অংশকে সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তির বিশেষায়িত ক্ষেত্রে প্রশিক্ষিত করতে পারলে বাংলাদেশ বৈশ্বিক চিপ নকশা ও প্রকৌশল সেবা খাতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
এই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে ইউএলকাসেমিও তরুণ প্রকৌশলী ও শিক্ষার্থীদের দক্ষতা উন্নয়নে বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছে। অ্যানালগ ও ডিজিটাল নকশা যাচাই এবং চিপ বিন্যাস প্রকৌশলের মতো বিশেষায়িত ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
চারজন প্রকৌশলী নিয়ে শুরু হওয়া একটি উদ্যোগ আজ শত শত প্রকৌশলীর কর্মক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। এনায়েতুর রহমানের এই যাত্রা দেখাচ্ছে, প্রয়োজনীয় দক্ষতা, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও আন্তর্জাতিক সংযোগ থাকলে বাংলাদেশে বসেও বৈশ্বিক উচ্চপ্রযুক্তির বাজারে প্রতিযোগিতা করা সম্ভব।