
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যায় বিপর্যস্ত নেপাল। আকস্মিক হিমবাহ ধসের পর সৃষ্ট ঢলে ভোতেকোশি ও ত্রিশূলী নদীর আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। কাদা ও ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়েছে ঘরবাড়ি, সড়ক, সেতুসহ বিভিন্ন স্থাপনা। উদ্ধার অভিযান যত এগোচ্ছে, ততই বাড়ছে মৃতের সংখ্যা।
শুক্রবার (২৮ আগস্ট) সর্বশেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, নেপালে বন্যায় ৩৮৯ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এখনও হাজারের বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। নেপাল পুলিশের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি।
এর আগে মৃতের সংখ্যা ৩৫৯ জন বলে জানানো হয়েছিল। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানেই আরও ৩০ জনের মরদেহ উদ্ধারের তথ্য পাওয়া যায়। ফলে উদ্ধার অভিযান চলার সঙ্গে সঙ্গে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

গত বুধবার (২৬ আগস্ট) সকালে রাসুয়া জেলার দিকে আকস্মিক ঢল নেমে আসে। হিমবাহ ধসের পর চীন ও নেপালের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত লেন্দে নদীতে বিপুল পরিমাণ কাদা ও ধ্বংসস্তূপ নেমে আসায় পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটে। পরে প্রবল স্রোত ভোতেকোশি ও ত্রিশূলী নদীর আশপাশের শহর ও গ্রামগুলোতে আঘাত হানে।
বন্যার পানিতে ভেসে যায় অসংখ্য ঘরবাড়ি, সড়ক ও সেতু। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। ওপর থেকে ধারণ করা ভিডিওতে বিপর্যয়ের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে—যেসব এলাকায় আগে মানুষের ব্যস্ততা ছিল, সেসব জায়গা এখন কাদা ও ধ্বংসস্তূপে ঢেকে গেছে।
উদ্ধার কাজে নেপালের সেনাবাহিনী আকাশপথে অভিযান চালাচ্ছে। দুর্গম ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় আটকে পড়া মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
আন্তর্জাতিক ফেডারেশন অব রেড ক্রস অ্যান্ড রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিজের (আইএফআরসি) নেপাল প্রধান ডেভিড ফিশার জানান, বন্যায় কিছু গ্রাম ও ব্যস্ত বাজার এলাকা পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।
নিখোঁজদের মধ্যে বিদেশি নাগরিকও
বন্যায় নিখোঁজদের মধ্যে বিদেশি নাগরিকও রয়েছেন। নেপালের পর্যটন বোর্ড জানিয়েছে, নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে ১৪২ জন ভারতের নাগরিক। এ ছাড়া অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়াসহ বিভিন্ন দেশের পর্যটকরাও নিখোঁজ রয়েছেন।
নতুন বন্যার শঙ্কা
এক বিপর্যয় কাটিয়ে ওঠার আগেই একই এলাকায় নতুন করে বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। চীন-নেপাল সীমান্তের উজানে নদীর প্রবাহে বিপুল ধ্বংসস্তূপ আটকে থাকায় সেখানে পানি জমে নতুন বিপর্যয় তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
কাঠমান্ডুভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেইন ডেভেলপমেন্টের (ইসিমোড) জলবায়ুঝুঁকি বিশেষজ্ঞ চিয়াংগং ঝাং জানান, সীমান্তবর্তী নদীর উজানে ধ্বংসস্তূপ আটকে রয়েছে। সেখানে পানি জমে গেলে হঠাৎ বাধ ভেঙে ভাটির দিকে প্রবল স্রোত নেমে আসতে পারে।
চীনও একই ধরনের সতর্কতা দিয়েছে। দেশটির পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মতে, প্রাকৃতিক বাধের কারণে নদীর পানি আটকে নেপালে একটি নতুন হ্রদের সৃষ্টি হয়েছে। এই হ্রদের পানি উপচে পড়লে অথবা প্রাকৃতিক বাধ ভেঙে গেলে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে নতুন করে ভয়াবহ বন্যা দেখা দিতে পারে।
চীনের হিসাব অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সকালে নতুন সৃষ্ট হ্রদটিতে প্রায় ২০ লাখ ঘনমিটার পানি জমেছিল। আগামী তিন দিনে সেখানে আরও প্রায় ৩০ লাখ ঘনমিটার পানি জমতে পারে।
তিব্বতে উৎপত্তি হওয়া ছোচেন খোলা ও পুরেপু সাংপো নদীর মিলনস্থলের কাছে হ্রদটির সৃষ্টি হয়েছে। সম্ভাব্য ঝুঁকি বিবেচনায় এলাকাটির ওপর নিবিড় নজরদারি চালাচ্ছে চীনা কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে নতুন করে বন্যা দেখা দিলে সম্ভাব্য পরিস্থিতি মোকাবিলা ও জরুরি উদ্ধার তৎপরতার প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে।
এদিকে নেপালে চলমান উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তবে নতুন বন্যার আশঙ্কা দেখা দেওয়ায় উদ্ধারকর্মী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।