
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মালয়েশিয়া থেকে ১ হাজার ৪৭৬ জন মিয়ানমারের অভিবাসীকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। রোববার (৪ অক্টোবর) তিনটি নৌযানে করে তাদের মিয়ানমারে পাঠানো হয়। চলমান গৃহযুদ্ধ, মানবাধিকার পরিস্থিতি ও নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে এ প্রত্যাবাসন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন।
মিয়ানমারের নৌবাহিনীর তিনটি জাহাজ স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ৭টার আগে থানলিনের একটি নৌঘাঁটিতে পৌঁছায়। সেখানে স্বজনদের অপেক্ষায় ছিলেন কয়েকশ মানুষ। তারা দীর্ঘদিন পর দেশে ফেরা পরিবারের সদস্যদের নিতে নৌঘাঁটির বাইরে জড়ো হন।
৫৫ বছর বয়সী কিয়াও মিন্ট জানান, প্রায় দেড় বছর ধরে মালয়েশিয়ায় আটক থাকা তার তিন নাতিকে নিতে তিনি এসেছেন। ছয় বছর ধরে তাদের সঙ্গে তার দেখা হয়নি। কারাগারে যাওয়ার পর থেকে তাদের সঙ্গে যোগাযোগও ছিল না।
তবে দেশে ফেরার পর তাদের সামরিক বাহিনী বা জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীতে জোর করে নিয়োগ করা হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
মিয়ানমার সরকারের তথ্য অনুযায়ী, মালয়েশিয়া থেকে ফেরত পাঠানো ১ হাজার ৪৭৬ জনকে তিনটি নৌযানে করে দেশে আনা হয়েছে। প্রায় ৫ হাজার অভিবাসীকে পর্যায়ক্রমে ফেরত পাঠানোর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এটি প্রথম ধাপ। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে করা সমঝোতার ভিত্তিতে এ প্রত্যাবাসন হচ্ছে।
ফেরত পাঠানো ব্যক্তিদের মধ্যে ২৭ শিশু ও ৭৯ নারী রয়েছেন। বাকি ১ হাজার ৩৭০ জন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ বলে মালয়েশিয়ার সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।
তবে প্রত্যাবাসনকারীদের মধ্যে রোহিঙ্গা রয়েছেন কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত মিয়ানমারের শরণার্থী ও আশ্রয়প্রার্থীদের একটি বড় অংশ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর।
মালয়েশিয়া সরকারের দাবি, আটককেন্দ্রে থাকা ব্যক্তিরা স্বেচ্ছায় দেশে ফেরার সম্মতি দিয়েছেন। মিয়ানমারও জানিয়েছে, তাদের অনেকেই অভিবাসন-সংক্রান্ত অপরাধে সাজা ভোগ করেছেন। তবে আটককেন্দ্রের পরিস্থিতি এবং প্রত্যাবাসনের প্রক্রিয়া নিয়ে মানবাধিকার সংগঠনগুলো প্রশ্ন তুলেছে।
জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা জানিয়েছে, দেশে ফেরত পাঠানো ব্যক্তিদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলে তারা স্বাধীনভাবে ও পর্যাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন কি না, তা যাচাই করার সুযোগ পায়নি। ফলে প্রত্যাবাসনটি আন্তর্জাতিক আইনের নিরাপদ প্রত্যাবাসনের মানদণ্ড পূরণ করছে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
২০২১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে মিয়ানমারে সংঘাত ও সহিংসতা অব্যাহত রয়েছে। সম্প্রতি রাখাইন রাজ্যের পশ্চিমাঞ্চলে একটি বাজারে সামরিক বাহিনীর বিমান হামলায় প্রায় ৫০ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। সংঘাত পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা এসিএলইডির হিসাবে, দেশটির চলমান গৃহযুদ্ধে এ পর্যন্ত এক লাখের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।
এ পরিস্থিতিতে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও জোরালো হয়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক প্রধান ভলকার টুর্কও মালয়েশিয়ার এ প্রত্যাবাসনের সমালোচনা করেছেন। তার মতে, গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন ও নির্যাতনের অভিযোগ থাকা মিয়ানমারে এখন কাউকে জোরপূর্বক ফেরত পাঠানোর সময় নয়।
এদিকে মালয়েশিয়া আরও ৩ হাজার ৫০০-এর বেশি মিয়ানমারের অভিবাসীকে ফেরত পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দাবি, এসব অভিবাসীর উপস্থিতি সরকারের ওপর আর্থিক চাপ বাড়ানোর পাশাপাশি সামাজিক ও নিরাপত্তাজনিত সমস্যাও তৈরি করছে।