
বরেন্দ্রকণ্ঠ ডেস্ক
দীর্ঘদিনের অপেক্ষার পর অবশেষে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা অবসর ও কল্যাণসুবিধার অর্থ পেতে শুরু করেছেন। আবেদনকারী শিক্ষক-কর্মচারীদের বড় একটি অংশের অনুকূলে একসঙ্গে অবসরসুবিধা ও কল্যাণসুবিধার অর্থের একটি অংশ ছাড় করেছে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী অবসরসুবিধা বোর্ড এবং শিক্ষক ও কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্ট।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এবার ৭০ হাজার ১১৯ জন শিক্ষক-কর্মচারীর অবসরসুবিধার একাংশ বাবদ প্রায় ১ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা ছাড় করা হয়েছে। ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত যারা অবসরসুবিধার জন্য আবেদন করেছেন, তাদের অনুকূলে এই অর্থ দেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে অনেকে টাকা পেয়েছেন। বাকিদের পর্যায়ক্রমে দেওয়ার কথা জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
তবে আবেদনকারী শিক্ষক-কর্মচারীদের পুরো প্রাপ্য অর্থ এখনো দেওয়া হচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, পুরো অর্থ পরিশোধ করতে সরকারের বিশেষ বরাদ্দ প্রয়োজন।
অন্যদিকে কল্যাণসুবিধার ক্ষেত্রেও ৫৩ হাজার ৪৭৭টি আবেদনের বিপরীতে প্রায় ৬৪৭ কোটি টাকা ছাড় করা হয়েছে। চাকরিকালে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন থেকে কেটে রাখা চাঁদা, ব্যাংকে জমা অর্থের সুদ এবং সরকারের বিভিন্ন সময়ে দেওয়া বরাদ্দ ও বন্ডের মুনাফা থেকে মূলত এসব সুবিধার অর্থ পরিশোধ করা হয়।
রোববার (১৬ আগস্ট) রাজধানীর ইস্কাটন গার্ডেন এলাকায় অবস্থিত অবসরসুবিধা বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্টের কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, বেশ কয়েকজন শিক্ষক-কর্মচারী ও তাদের স্বজনেরা টাকা না পাওয়ার বিষয়ে খোঁজ নিতে এসেছেন। কর্মকর্তারা তাদের সমস্যার কথা শুনে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে পরামর্শ দিচ্ছেন।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ‘আইবাস প্লাস প্লাস’ সফটওয়্যারের মাধ্যমে সরাসরি শিক্ষক-কর্মচারীদের ব্যাংক হিসাবে টাকা পাঠানো হচ্ছে। এ সময় জাতীয় পরিচয়পত্র, ব্যাংক হিসাবসহ আবেদনের বিভিন্ন তথ্য যাচাই করা হচ্ছে। আবেদনে সামান্য ভুল বা অসঙ্গতি থাকলেও অর্থ পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না। প্রয়োজনীয় তথ্য সংশোধনের পর পুনরায় অর্থ পাঠানো হবে।
একজন অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ অবসরসুবিধা বোর্ডের কার্যালয়ে এসে জানতে চান, তার মোট প্রাপ্য অর্থের তুলনায় এবার কেন কম টাকা দেওয়া হয়েছে। তাকে কর্মকর্তারা জানান, আপাতত চাকরিকালে বেতন থেকে কেটে রাখা চাঁদার একটি অংশের অর্থ দেওয়া হচ্ছে। বাকি অর্থ পরবর্তী সময়ে পরিশোধ করা হবে।
কল্যাণ ট্রাস্টের এক অবসরপ্রাপ্ত নারী শিক্ষক জানান, তিনি প্রায় ১ লাখ ৯০ হাজার টাকা পেয়েছেন। তবে তার বাকি প্রাপ্য অর্থ কবে পাবেন, তা জানতে চান তিনি। কর্মকর্তারা তাকে জানান, এটিও কল্যাণসুবিধার একটি অংশ; বাকি অর্থ পরবর্তী সময়ে দেওয়া হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চার হাজারের বেশি আবেদনকারীর আবেদন অসম্পূর্ণ থাকায় তাদের অনুকূলে আপাতত অর্থ ছাড় করা যায়নি। এ ছাড়া জাতীয় পরিচয়পত্র, ব্যাংক হিসাব কিংবা মনোনীত ব্যক্তির কাগজপত্রে ভুল থাকায় আরও কিছু আবেদনকারীর অর্থ ছাড় আটকে আছে।
দীর্ঘসূত্রতায় ক্ষোভ
বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের অবসরসুবিধার অর্থ পেতে দীর্ঘদিন ধরেই জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতার অভিযোগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে অবসরের পর প্রাপ্য অর্থ পেতে তিন থেকে চার বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। এ নিয়ে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগও দীর্ঘদিনের।
শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে দাবি করেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে শিক্ষকদের অবসর ভাতা ও কল্যাণ ট্রাস্টের প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে।
২০১৫ সালে নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের পর অবসরসুবিধা প্রদানে দীর্ঘসূত্রতা আরও বেড়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের অনেকে মনে করেন। দীর্ঘ অপেক্ষার কারণে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল। বর্তমান অর্থ ছাড়ের উদ্যোগে সেই পরিস্থিতির কিছুটা অবসান হবে বলে আশা করছেন তারা।
পুরো টাকা পেতে প্রয়োজন বড় বরাদ্দ
সংশ্লিষ্ট সূত্রের হিসাবে, এখন পর্যন্ত আবেদন করা ৭০ হাজার ১১৯ জন শিক্ষক-কর্মচারীর অবসরসুবিধার পুরো অর্থ পরিশোধ করতে প্রায় ৯ হাজার ৭৩০ কোটি টাকা প্রয়োজন। অথচ অবসরসুবিধা বোর্ডে বর্তমানে রয়েছে প্রায় ১ হাজার ৭৫৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা এবার ছাড় করা হচ্ছে।
ফলে বর্তমান তহবিলের অর্থ দিয়ে আবেদনকারীদের পুরো প্রাপ্য পরিশোধ করা সম্ভব নয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, দ্রুত সব আবেদনকারীর প্রাপ্য অর্থ পরিশোধ করতে হলে সরকারের বিশেষ বরাদ্দ প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র আরও জানায়, অবসরসুবিধার জন্য শিক্ষক-কর্মচারীদের কাছ থেকে বর্তমানে প্রতি মাসে প্রায় ১০৪ কোটি টাকা চাঁদা জমা হয়। অন্যদিকে অবসর নেওয়া শিক্ষক-কর্মচারীদের প্রাপ্য পুরো অর্থ পরিশোধে মাসে গড়ে প্রায় ২১০ কোটি টাকা প্রয়োজন হয়। এতে প্রতি মাসেই বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।
কত টাকা পাচ্ছেন শিক্ষক-কর্মচারীরা
চাকরিকালে শিক্ষক-কর্মচারীদের মূল বেতনের ৬ শতাংশ অবসরসুবিধা এবং ৪ শতাংশ কল্যাণসুবিধার জন্য চাঁদা কেটে রাখা হয়। ২০১৯ সাল পর্যন্ত এই হারে চাঁদা নেওয়া হয়েছে। এর আগে অবসরসুবিধার জন্য ৪ শতাংশ এবং কল্যাণসুবিধার জন্য ২ শতাংশ হারে চাঁদা নেওয়া হতো।
এ ছাড়া প্রত্যেক শিক্ষার্থীর কাছ থেকে বছরে ১০০ টাকা নেওয়া হয়। এর মধ্যে ৭০ টাকা অবসরসুবিধা এবং ৩০ টাকা কল্যাণসুবিধা তহবিলে জমা হয়।
কল্যাণসুবিধার ক্ষেত্রে শিক্ষক-কর্মচারীরা প্রায় ৫ হাজার টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৩ লাখ ১৬ হাজার টাকা পর্যন্ত পেয়ে থাকেন। অবসরসুবিধার ক্ষেত্রে এবার একাংশের অর্থ দেওয়া হলেও একজন শিক্ষক-কর্মচারী সর্বোচ্চ প্রায় সাড়ে চার লাখ টাকা পর্যন্ত পাচ্ছেন।
তবে গ্রেড ও চাকরিকালের ওপর ভিত্তি করে একজন শিক্ষক-কর্মচারীর মোট প্রাপ্য অর্থ কমবেশি হয়। সর্বোচ্চ গ্রেডের একজন শিক্ষক অবসরসুবিধা হিসেবে মোট প্রায় ৩৮ লাখ টাকা এবং কল্যাণসুবিধা হিসেবে প্রায় ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত পেতে পারেন।
দেশে এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-কর্মচারীর সংখ্যা ছয় লাখের বেশি। তাদের অবসরসুবিধা ও কল্যাণসুবিধা পৃথক দুটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালিত হয়।
দীর্ঘ অপেক্ষার পর অর্থ ছাড়ের উদ্যোগে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরলেও তাদের প্রত্যাশা, দ্রুতই বাকি প্রাপ্য অর্থ পরিশোধ করা হবে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও বলছেন, পর্যায়ক্রমে অর্থ পরিশোধের কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।