
বরেন্দ্রকণ্ঠ নিউজ
মাদকের বিস্তার ঠেকাতে সরকারের ঘোষিত ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি বাস্তবায়নে সারাদেশে বিশেষ অভিযান শুরু হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সমন্বয়ে পরিচালিত এসব অভিযানে মাদক কারবারি ও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিদ্যমান আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
বর্তমানে দেশে মাদকসংক্রান্ত অপরাধের বিচার হচ্ছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮ অনুযায়ী। এ আইনে অপরাধের ধরন ও মাদকের পরিমাণভেদে বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের পাশাপাশি গুরুতর কিছু অপরাধে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড কিংবা মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
আইনের প্রথম তফসিলে মাদকদ্রব্যকে ‘ক’, ‘খ’ ও ‘গ’—এই তিন শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। ‘ক’ শ্রেণিতে হেরোইন, কোকেন, ইয়াবা বা অ্যামফিটামিন, মরফিন, আফিমসহ অপেক্ষাকৃত ভয়ংকর মাদকদ্রব্য রাখা হয়েছে। ‘খ’ শ্রেণিতে রয়েছে গাঁজা, ভাং ও চরসের মতো মাদক। আর ‘গ’ শ্রেণিতে অ্যালকোহল, বিয়ার, দেশি মদ ও রেকটিফাইড স্পিরিটসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্য অন্তর্ভুক্ত।
গুরুতর অপরাধে সর্বোচ্চ শাস্তি
আইনের ধারা ৩৬(১)-এর সারণিতে মাদক অপরাধের জন্য শাস্তির বিস্তারিত বিধান রয়েছে। ‘ক’ শ্রেণির নির্দিষ্ট মাদক নির্ধারিত পরিমাণের বেশি উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, বহন, পরিবহন, আমদানি-রপ্তানি, ক্রয়-বিক্রয়, সংরক্ষণ বা হস্তান্তরের মতো অপরাধে সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।
হেরোইন, কোকেন ও মরফিনজাতীয় মাদকের পরিমাণ ২৫ গ্রাম বা মিলিলিটারের বেশি হলে এবং ইয়াবা বা অ্যামফিটামিনের পরিমাণ নির্ধারিত সীমার বেশি হলে সংশ্লিষ্ট অপরাধে কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে।
এ ছাড়া মাদকের পরিমাণ কম হলে অপরাধের ধরন অনুযায়ী কারাদণ্ডের মেয়াদও নির্ধারিত হয়েছে। ‘খ’ শ্রেণির গাঁজা, ভাং ও চরসের ক্ষেত্রেও পরিমাণভেদে কয়েক বছর থেকে সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।
মাদক সেবনেও কারাদণ্ড
শুধু মাদক বহন বা বিক্রিই নয়, মাদক সেবনের ক্ষেত্রেও আইনে শাস্তির বিধান রয়েছে। ‘ক’ ও ‘খ’ শ্রেণির মাদক সেবনের অপরাধে সর্বনিম্ন তিন মাস থেকে সর্বোচ্চ দুই বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড হতে পারে।
তবে মাদকাসক্ত ব্যক্তিকে চিকিৎসার সুযোগও আইনে রাখা হয়েছে। আদালত চাইলে কারাদণ্ডের পরিবর্তে তাকে মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে চিকিৎসার জন্য পাঠাতে পারেন। চিকিৎসা নিতে অনিচ্ছুক হলে আইনের বিধান অনুযায়ী কারাদণ্ড দেওয়া যেতে পারে।
নেশাগ্রস্ত অবস্থায় জনশান্তি বিঘ্নিত করা কিংবা যানবাহন চালানোর ক্ষেত্রেও শাস্তির বিধান রয়েছে।
দ্রুত বিচার ও জামিনে কঠোরতা
মাদকসংক্রান্ত অপরাধগুলোকে আমলযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে জামিন পাওয়ার সুযোগও সীমিত। নারী, শিশু বা শারীরিকভাবে বিকলাঙ্গ ব্যক্তির ক্ষেত্রে বিশেষ বিবেচনার সুযোগ থাকলেও অন্যান্য ক্ষেত্রে আদালতকে জামিন দেওয়ার বিষয়ে কঠোরতা অবলম্বনের বিধান রয়েছে।
আইনের সংশ্লিষ্ট ধারাগুলো অনুযায়ী গুরুতর মাদক অপরাধের বিচার দ্রুত শেষ করার বিধান রয়েছে এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার কথা বলা হয়েছে।
মোবাইল কোর্টেও ব্যবস্থা
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের নির্দিষ্ট কিছু অপরাধে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে দ্রুত বিচার ও শাস্তির সুযোগ রয়েছে। মাদক সেবনসহ কিছু অপরাধে সর্বোচ্চ দুই বছর পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া যেতে পারে।
এ ছাড়া তল্লাশি ও গ্রেফতারের ক্ষমতার অপব্যবহার করে কোনো ব্যক্তিকে অযথা হয়রানি করলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে।
আইনে শাস্তির পাশাপাশি চিকিৎসার সুযোগ
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট খালিদ হোসাইন বলেন, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনটি সময়োপযোগী। এতে মাদক ব্যবসা ও গুরুতর অপরাধের জন্য কঠোর শাস্তির পাশাপাশি মাদকাসক্তদের চিকিৎসার সুযোগ রাখা হয়েছে।
তিনি বলেন, মাদকসেবীদের শুধুমাত্র অপরাধী হিসেবে না দেখে চিকিৎসার সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি আইনের একটি মানবিক দিক। একই সঙ্গে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে নির্দিষ্ট অপরাধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকায় মাঠ পর্যায়ে মাদক নিয়ন্ত্রণে তা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
এদিকে ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মো. আকতার হোসেন বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চলছে। মাদক কারবার বা সংশ্লিষ্টতার সঙ্গে জড়িত কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।
সরকারের জিরো টলারেন্স নীতির অংশ হিসেবে সারাদেশে এই অভিযান আরও জোরদার করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।