
বরেন্দ্রকণ্ঠ নিউজ
সরকারি চাকরির ১১ থেকে ২০তম গ্রেডে নিয়োগের ক্ষেত্রে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় সমান নম্বর রাখার সিদ্ধান্ত নিয়ে শুরু হয়েছে আলোচনা-সমালোচনা। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, নিয়োগ পরীক্ষায় প্রক্সি ও জালিয়াতি ঠেকিয়ে দক্ষ জনবল বাছাইয়ের লক্ষ্যেই এই পরিবর্তন। তবে সাবেক আমলা ও প্রশাসন বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, ভাইভার নম্বর বাড়লে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও মেধাভিত্তিক প্রতিযোগিতা প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
মঙ্গলবার সচিবালয়ে তথ্য অধিদপ্তরের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত সাপ্তাহিক প্রেস ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, ভাইভার নম্বর বাড়ানোর সিদ্ধান্ত কোনো বিশেষ গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়া বা বৈষম্য তৈরির উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়নি। প্রশাসনে দক্ষ ও যোগ্য জনবল নিশ্চিত করতেই এ পরিবর্তন আনা হয়েছে বলে জানান তিনি।
নতুন ব্যবস্থায় মন্ত্রণালয়, বিভাগ এবং তাদের অধীন দপ্তর-সংস্থায় ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের সরাসরি নিয়োগে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় ৫০:৫০ নম্বর রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। প্রশাসনিক উন্নয়নসংক্রান্ত সচিব কমিটির সভায় এ বিষয়ে ‘পরীক্ষার মানবণ্টন বিশেষ বিধিমালা-২০২৬’ অনুমোদনের প্রক্রিয়া এগিয়েছে।
প্রক্সি ঠেকাতেই পরিবর্তন, বলছে সরকার
সংশ্লিষ্ট নথিতে বলা হয়েছে, বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষায় প্রক্সি ও জালিয়াতির মাধ্যমে চাকরি পাওয়ার চেষ্টা ধরা পড়ছে। এতে প্রকৃত চাকরিপ্রার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বাভাবিকতা ব্যাহত হচ্ছে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার নম্বর সমান করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। সরকারের যুক্তি, এতে অন্যান্য যোগ্যতার পাশাপাশি প্রার্থীর মৌখিক মূল্যায়নও নিয়োগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এর আগে বিভিন্ন দপ্তরের নিয়োগবিধির মধ্যে সামঞ্জস্য আনতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. হুমায়ুন কবীরকে সভাপতি করে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, অর্থ বিভাগ এবং লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগের প্রতিনিধিরা ছিলেন।
তবে কমিটির সভাপতি হুমায়ুন কবীর জানিয়েছেন, ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের নিয়োগে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার নম্বর কত রাখার সুপারিশ করা হয়েছে, তা এই মুহূর্তে তিনি বলতে পারছেন না।
বিশেষজ্ঞদের আপত্তি কোথায়
নতুন মানবণ্টন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সাবেক আমলা ও প্রশাসন বিশেষজ্ঞদের অনেকে। তাদের আশঙ্কা, লিখিত পরীক্ষার তুলনায় ভাইভার ওজন বেড়ে গেলে নিয়োগে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ বা প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সাবেক সচিব একেএম আবদুল আউয়াল মজুমদারের মতে, লিখিত পরীক্ষায় বেশি নম্বর রাখাই নিয়োগে স্বচ্ছতা ও মেধার মূল্যায়নের জন্য বেশি কার্যকর। তাঁর মতে, ৮০ নম্বরের লিখিত ও ২০ নম্বরের মৌখিক পরীক্ষা আগের ব্যবস্থাই বহাল রাখা উচিত।
সাবেক অতিরিক্ত সচিব ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়াও নতুন ব্যবস্থার সমালোচনা করেছেন। তাঁর আশঙ্কা, ভাইভার নম্বর বাড়ানো হলে দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার সুযোগ বাড়তে পারে। পাশাপাশি বিভিন্ন কারিগরি পদের আলাদা নিয়োগবিধির সঙ্গে নতুন মানবণ্টন সমন্বয় করতেও জটিলতা তৈরি হতে পারে।
সাবেক সচিব আনোয়ার ফারুকও লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় সমান নম্বর রাখার বিরোধিতা করেছেন। তাঁর মতে, লিখিত পরীক্ষায় বেশি গুরুত্ব না থাকলে নিয়োগে নিরপেক্ষতা বজায় রাখা কঠিন হতে পারে।
মেধা যাচাই নাকি নতুন ঝুঁকি?
আগের ব্যবস্থায় সাধারণত লিখিত পরীক্ষায় ৭৫ বা ৮০ এবং ভাইভায় ২০ বা ২৫ নম্বর থাকত। ফলে লিখিত পরীক্ষায় ভালো করা প্রার্থীরা চূড়ান্ত বাছাইয়ে তুলনামূলকভাবে এগিয়ে থাকতেন।
নতুন ৫০:৫০ ব্যবস্থায় ভাইভার গুরুত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাবে। সমালোচকদের প্রশ্ন, লিখিত পরীক্ষায় তুলনামূলক কম নম্বর পাওয়া একজন প্রার্থী যদি মৌখিক পরীক্ষায় বেশি নম্বর পান, তাহলে তিনি লিখিত পরীক্ষায় বেশি নম্বর পাওয়া প্রার্থীকে পেছনে ফেলতে পারেন।
অন্যদিকে সরকারের যুক্তি হলো, শুধু লিখিত পরীক্ষার ফলের ভিত্তিতে নয়, প্রার্থীর সামগ্রিক যোগ্যতা যাচাই করেই দক্ষ প্রশাসনিক জনবল নির্বাচন করা প্রয়োজন। প্রক্সি ও জালিয়াতি বন্ধ করার বিষয়টিও নতুন ব্যবস্থার অন্যতম কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
ফলে ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের চাকরিতে নতুন মানবণ্টন কার্যকর হলে লিখিত পরীক্ষা ও ভাইভার ভারসাম্য কীভাবে মেধা, স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করবে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। একদিকে সরকারের দক্ষ জনবল তৈরির লক্ষ্য, অন্যদিকে বিশেষজ্ঞদের স্বচ্ছতা নিয়ে আশঙ্কা—দুই পক্ষের এই অবস্থানকে ঘিরেই নতুন বিধিমালা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।