
বরেন্দ্রকণ্ঠ নিউজ
১৯৮০ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে দেওয়া প্রথম ভাষণে বাংলাদেশের উন্নয়ন, আত্মনির্ভরতা এবং দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। দেশের আর্থসামাজিক সংকট মোকাবিলায় কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পাশাপাশি তিনি দক্ষিণ এশিয়ায় শান্তি, স্থিতিশীলতা ও পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদারের আহ্বান জানান।
২৬ আগস্ট ১৯৮০ জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দেওয়া ভাষণে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের জনসংখ্যার ঘনত্ব, বেকারত্ব, ভূমিহীনতা, নিম্ন মাথাপিছু আয় এবং খাদ্যনিরাপত্তার মতো বড় চ্যালেঞ্জগুলোর কথা তুলে ধরেন। সীমিত সম্পদ ও কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও বাংলাদেশ উন্নয়নের পথে এগিয়ে যেতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বলেও তিনি জানান।
বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনায় কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি খাদ্য উৎপাদন বাড়ানো, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নের ওপর জোর দেন। তাঁর বক্তব্যে দেশের বিপুল জনগোষ্ঠীকে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করার প্রয়োজনীয়তাও উঠে আসে।
জিয়াউর রহমান তাঁর ভাষণে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সম্প্রসারণ এবং মানুষের মৌলিক চাহিদা নিশ্চিত করার বিভিন্ন লক্ষ্যের কথা তুলে ধরেন। খাদ্য, বাসস্থান ও পোশাকের মতো মৌলিক প্রয়োজন থেকে কোনো মানুষ যেন বঞ্চিত না হন—এমন একটি সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়ের কথাও তিনি জানান।
দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ প্রসঙ্গে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি অঙ্গীকারের কথা উল্লেখ করেন জিয়াউর রহমান। একই সঙ্গে আত্মনির্ভরতাকে বাংলাদেশের উন্নয়নের অন্যতম মূল ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরেন তিনি।
দক্ষিণ এশিয়ায় সহযোগিতার আহ্বান
জিয়ার ভাষণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সহযোগিতা। তিনি মনে করেন, এ অঞ্চলের শান্তি ও স্থিতিশীলতার সঙ্গে দেশগুলোর অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে একটি শীর্ষ সম্মেলনের প্রস্তাবের কথাও তিনি জাতিসংঘে তুলে ধরেন। বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে আঞ্চলিক সহযোগিতার বিভিন্ন উদ্যোগ থাকলেও দক্ষিণ এশিয়ায় এমন কার্যকর কাঠামো তখনও গড়ে ওঠেনি বলে তিনি উল্লেখ করেন।
পারস্পরিক স্বার্থে সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে জিয়াউর রহমান আঞ্চলিক সহযোগিতাকে উত্তেজনা কমানোর একটি কার্যকর উপায় হিসেবে দেখেন। তাঁর বক্তব্যে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক মতপার্থক্যের পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্বার্থে একসঙ্গে কাজ করার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্টভাবে উঠে আসে।
বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বৈষম্য নিয়েও উদ্বেগ
জাতিসংঘের ভাষণে উন্নত ও উন্নয়নশীল বিশ্বের মধ্যে ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিষয়টিও তুলে ধরেন জিয়াউর রহমান। তাঁর বক্তব্য ছিল, বিশ্বের একটি বড় জনগোষ্ঠী যদি দারিদ্র্য ও বঞ্চনার মধ্যে থাকে, তাহলে দীর্ঘস্থায়ী বৈশ্বিক শান্তি প্রতিষ্ঠা কঠিন।
এ জন্য উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য আরও বেশি উন্নয়ন সহায়তা, প্রযুক্তি ও সম্পদ হস্তান্তর এবং ন্যায্য বাণিজ্য নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি। স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য সহায়তা বাড়ানো এবং তা আরও সহজ শর্তে দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন।
তৎকালীন বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে বাংলাদেশের মতো স্বল্পোন্নত দেশগুলোর ওপর তৈরি হওয়া অর্থনৈতিক চাপের বিষয়টিও তাঁর বক্তব্যে গুরুত্ব পায়। জ্বালানি ও উন্নয়ন সহায়তার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্বশীল ভূমিকার আহ্বান জানান তিনি।
চার দশক পর একই মঞ্চে তারেক রহমান
জিয়াউর রহমানের সেই ভাষণের চার দশকের বেশি সময় পর এবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের একই মঞ্চে ভাষণ দিতে যাচ্ছেন তাঁর ছেলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে প্রথমবারের মতো বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে তাঁর।
এর আগে জিয়াউর রহমানের পর তাঁর স্ত্রী সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াও জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। খালেদা জিয়া ১৯৯৩ সালের ১ অক্টোবর সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেন।
ফলে তারেক রহমানের আসন্ন ভাষণকে জিয়া পরিবারের তৃতীয় সদস্যের জাতিসংঘে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব হিসেবে দেখা হচ্ছে। তাঁর বক্তব্যে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা, বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন এবং রোহিঙ্গা সংকটসহ বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ইস্যু গুরুত্ব পেতে পারে।
১৯৮০ সালে জিয়াউর রহমান যে আত্মনির্ভরতা, আঞ্চলিক সহযোগিতা ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ন্যায্যতার বিষয়গুলো জাতিসংঘের মঞ্চে তুলে ধরেছিলেন, চার দশকের বেশি সময় পর একই পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে তারেক রহমানের বক্তব্যে বাংলাদেশের বর্তমান অগ্রাধিকার ও আন্তর্জাতিক অবস্থান কীভাবে প্রতিফলিত হয়, সেদিকেই এখন নজর আন্তর্জাতিক মহলের।