
বরেন্দ্রকণ্ঠ নিউজ
নারীবান্ধব পুলিশিং আরও কার্যকর করতে নারী পুলিশ সদস্যের সংখ্যা বৃদ্ধি, নারী-শিশু ও প্রবীণদের জন্য নির্ধারিত সেবা ডেস্ক আধুনিকায়ন এবং নারী পুলিশ সদস্যদের সন্তানদের জন্য ডে-কেয়ার সেন্টার স্থাপনসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ। পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে নারী সদস্যদের প্রশিক্ষণ, তদন্ত ও অপারেশনাল দায়িত্বে সম্পৃক্ততা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (আইজিপি সমপর্যায়ের) গাজী জসিম উদ্দিন বলেন, লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা, অনলাইন সহিংসতা, বিদ্বেষমূলক আচরণ ও বুলিং মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও সংবেদনশীল ও কার্যকর করার লক্ষ্যেই এসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর পাশাপাশি জেন্ডার-সংবেদনশীল পুলিশিংকে আরও বিস্তৃত করার কাজ চলছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিএনপি সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম ১৮০ দিনের কার্যক্রমসংক্রান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আটটি বিভাগীয় শহরে কর্মরত নারী পুলিশ সদস্যদের সন্তানদের জন্য ডে-কেয়ার সেন্টার স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে ৫-এপিবিএনের তত্ত্বাবধানে রাজধানীর উত্তরা এলাকায় একটি ডে-কেয়ার সেন্টার স্থাপনের কাজ চলছে।
এদিকে দেশের ৬৪ জেলার সদর থানায় নারী, শিশু ও প্রবীণদের জন্য নির্ধারিত সেবা ডেস্কগুলোকে আধুনিক ও কার্যকর সেবাকেন্দ্রে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশেষ প্রশিক্ষণের পাশাপাশি এসব ডেস্কে আধুনিক সরঞ্জাম সরবরাহের মাধ্যমে সেবার মান উন্নত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
ইউএনএফপিএর অর্থায়নে পরিচালিত ‘প্রিভেনশন অ্যান্ড রেসপন্স ফর জেন্ডার বেসড ভায়োলেন্স এগেইনস্ট উইমেন অ্যান্ড গার্লস (প্রিভিল)’ প্রকল্পের আওতায় ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশসহ ১০টি জেলার ৯২টি থানায় নারী ও শিশু হেল্প ডেস্ক চালু করা হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় নারী, শিশু ও প্রবীণদের অধিকার এবং আইনি সহায়তা বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের প্রাথমিক প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা কার্যক্রমও পরিচালিত হয়েছে।
অবশিষ্ট ৫৪টি জেলা সদর থানার সেবা ডেস্ককে আধুনিক সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মডেল সেবাকেন্দ্রে রূপান্তরের জন্য নতুন প্রকল্পের প্রস্তাব করা হয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশ পুলিশে নারী সদস্য রয়েছেন ১৭ হাজার ৯৭০ জন। মোট পুলিশ সদস্যের হিসাবে নারী সদস্যের হার ৯ দশমিক ০৭ শতাংশ। কনস্টেবল থেকে শুরু করে অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক সমপর্যায়ের পদ পর্যন্ত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নারী কর্মকর্তারা কাজ করছেন।
গাজী জসিম উদ্দিন বলেন, পেশাদারিত্ব, দক্ষতা ও নিষ্ঠার মাধ্যমে নারী পুলিশ সদস্যরা বাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ে নিজেদের সক্ষমতা তুলে ধরেছেন। শিল্পাঞ্চলেও তাঁদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন তিনি। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতে কর্মরত শ্রমিকদের বড় অংশ নারী হওয়ায় শ্রমিক অসন্তোষ মোকাবিলায় নারী পুলিশ সদস্যদের সম্পৃক্ততা কার্যকর ভূমিকা রাখছে বলে তিনি জানান।
একজন নারী উপপরিদর্শক (এসআই) বলেন, নারী কর্মকর্তারা বড় ধরনের অপারেশনাল দায়িত্ব পালনে সক্ষম। তবে গোয়েন্দা কার্যক্রম, অপরাধ তদন্ত এবং অপারেশনাল নেতৃত্বে তাঁদের আরও বেশি সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন।
বাংলাদেশ পুলিশে নারীদের আনুষ্ঠানিক অন্তর্ভুক্তি শুরু হয় ১৯৭৪ সালে। সময়ের সঙ্গে প্রশাসনিক ও সীমিত দায়িত্বের গণ্ডি পেরিয়ে নারী সদস্যরা পুলিশের বিভিন্ন শাখা ও গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজের সুযোগ পেয়েছেন। বর্তমানে কনস্টেবল, এএসআই, এসআই, পরিদর্শক, এএসপি, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, পুলিশ সুপার, ডিআইজি, অতিরিক্ত ডিআইজি এবং অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক সমপর্যায়ের পদেও নারী কর্মকর্তারা দায়িত্ব পালন করছেন।
জেলা ও মেট্রোপলিটন পুলিশ ছাড়াও আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন, স্পেশাল ব্রাঞ্চ, সিআইডি, পিবিআই, ট্যুরিস্ট পুলিশ, হাইওয়ে পুলিশ, রিভার পুলিশ, পুলিশ সদর দপ্তর এবং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনেও নারী পুলিশ সদস্যদের অংশগ্রহণ রয়েছে।
নারী পুলিশ সদস্যদের পেশাগত উন্নয়ন ও নেতৃত্ব বিকাশে ২০০৮ সালে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ পুলিশ উইমেন নেটওয়ার্ক (বিপিডব্লিউএন) কাজ করে যাচ্ছে। সংগঠনটির ২০২৪-২০২৭ মেয়াদের কৌশলগত পরিকল্পনায় পুলিশে নারীর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো, নেতৃত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণ বৃদ্ধি, তদন্ত ও পেশাগত দক্ষতা উন্নয়ন এবং নিরাপদ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মপরিবেশ তৈরির বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ পুলিশ জানিয়েছে, ২০২৭ সাল পর্যন্ত বিপিডব্লিউএনের কৌশলগত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পাশাপাশি নারী সদস্যদের শুধু সংখ্যাগত উপস্থিতি নয়, নেতৃত্ব, তদন্ত ও অপারেশন পরিচালনায় অংশগ্রহণের সুযোগও বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।