
বরেন্দ্রকণ্ঠ নিউজঃ
প্রবাসীদের সম্মান ও মর্যাদা নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাঁদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে ‘প্রবাসী কার্ড’ চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বর্তমানে পরীক্ষামূলক পর্যায়ে থাকা এ কার্ডের মাধ্যমে আর্থিক লেনদেন, চিকিৎসাসেবা, দূতাবাসের সেবা এবং দেশে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সুযোগ-সুবিধা সহজ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) ৩০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত দুই দিনব্যাপী সম্মেলনের প্রথম অধিবেশনে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক।
প্রতিমন্ত্রী জানান, জর্ডান, দক্ষিণ কোরিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশসহ বিভিন্ন জায়গায় প্রবাসী কার্ডের কার্যক্রম পরীক্ষামূলকভাবে চলছে। প্রবাসীদের জন্য বিশেষ সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে সরকার ১১টি খাতকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে।
নুরুল হক বলেন, প্রবাসীরা দেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। তাঁদের অবদান ও মর্যাদা যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের সমস্যা চিহ্নিত করে সেগুলোর কার্যকর সমাধানে সরকার কাজ করছে।
প্রবাসীদের প্রধান সমস্যাগুলোর কথা তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, পাসপোর্ট তৈরি করতে গিয়ে অনেককে দালালের সহায়তা নিতে হয়। পাসপোর্ট সেবায় দালালচক্র ও দুর্নীতি বন্ধ করা জরুরি। আবার অনেকে বিদেশে যাওয়ার পর চুক্তি অনুযায়ী কাজ পান না। ঋণ করে বিদেশে গিয়ে প্রত্যাশিত কাজ না পাওয়ায় তাঁদের কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। এর পাশাপাশি বিদেশে বাংলাদেশের দূতাবাসগুলো থেকে সেবা পেতে নানা জটিলতা এবং বিমানবন্দরের অব্যবস্থাপনা নিয়েও অভিযোগ রয়েছে।
তিনি বলেন, প্রবাসী কার্ডের মাধ্যমে এসব সেবা সহজ করার পরিকল্পনা রয়েছে। কার্ডে প্রবাসীদের মৌলিক তথ্য সংরক্ষণের পাশাপাশি বিদেশে বাংলাদেশের দূতাবাস এবং দেশে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সেবা পাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করা হবে। সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।
দেশে ফিরে জমিজমা নিয়ে বিরোধে জড়ানো প্রবাসীদের সমস্যা সমাধানেও উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী। তাঁর ভাষ্য, সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এসব সমস্যার প্রতিকার দেওয়ার ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। বিশেষ করে সাত দিনের মধ্যে প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করার সম্ভাবনা নিয়ে কাজ চলছে।
বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠাতে প্রবাসীদের উৎসাহিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। নুরুল হক জানান, বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠানোর ক্ষেত্রে তিন শতাংশ প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে। প্রবাসীদের আর্থিক সেবা সহজ করতে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংককে আরও কার্যকর করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং সাধারণ ব্যাংকিং সেবার সঙ্গে যুক্ত করার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। প্রবাসী কার্ডের সঙ্গে ব্যাংকটির সংযোগ স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে। বর্তমানে ব্যাংকটি থেকে প্রবাসীদের তিন লাখ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। এ ঋণসুবিধা বাড়ানোর পাশাপাশি দেশে ফিরে ব্যবসা, নতুন উদ্যোগ গ্রহণ কিংবা বাড়ি নির্মাণের জন্য ঋণপ্রাপ্তি সহজ করার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।
বিদেশে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে অনিয়ম ও অবৈধ প্রক্রিয়া বন্ধের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে তিনি বলেন, বিদেশে যাওয়ার প্রক্রিয়া স্বচ্ছ করা এবং প্রবাসীদের বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠাতে উৎসাহিত করা সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার।
অভিবাসন খাতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর অবদানের কথাও উল্লেখ করেন নুরুল হক। তিনি বলেন, গত পাঁচ দশকে দেশের উন্নয়নে বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। অভিবাসন ব্যবস্থার উন্নয়নেও এসব প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো প্রয়োজন। তরুণদের প্রত্যাশিত নতুন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসহ সবাইকে সম্মিলিতভাবে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
জোরপূর্বক ও স্বেচ্ছামূলক অভিবাসন এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বাস্তুচ্যুতি নিয়ে কাজের ৩০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ‘সোনার মানুষ সম্মিলন ২০২৬’ শীর্ষক এ সম্মেলন ও সাংস্কৃতিক আয়োজনের আয়োজন করে রামরু। সম্মেলনের লক্ষ্য অভিবাসন খাতে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরা, গবেষণালব্ধ জ্ঞান বিনিময় এবং ভবিষ্যৎ নীতিগত অগ্রাধিকার নির্ধারণ।
আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন দশকে রামরু ১০০টির বেশি গবেষণা পরিচালনা করেছে, ১৩টি জাতীয় নীতি ও কৌশল প্রণয়নে অবদান রেখেছে এবং দেশের ২১ জেলায় অভিবাসীদের অধিকারভিত্তিক সেবা দিয়েছে।
সম্মেলনে গবেষক, শিক্ষাবিদ, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, সাংস্কৃতিক কর্মী, দেশি-বিদেশি উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধি এবং গণমাধ্যমকর্মীরা অংশ নেন।