
হক আমীন
বাংলার উত্তরাঞ্চলের মাটিতে একসময় মেঠো পথ বেয়ে এগিয়ে যেত গরুর গাড়ী-ধীর, নিশ্চিন্ত আর জীবনের মতোই স্বাভাবিক ছন্দে। কুড়িগ্রামের সেই চিরচেনা দৃশ্য আজ যেন স্মৃতির পাতায় বন্দী। অথচ একসময় এ গরুর গাড়ীই ছিল গ্রামীন জীবনের প্রধান বাহন, তার সঙ্গী ছিল হৃদয় ছোঁয়া ভাওয়াইয়া গান।
"ধীরে বুলাও গাড়ীরে গাড়ীয়াল, আস্তে বুলাও গাড়ী, আরেক নজর দেখাইয়া নেও মুই দয়াল বাপের বাড়ি।" এ গান শুধু একটি সুর নয়, এটি একটুকরো জীবনচিত্র। মাটির গন্ধ, আপনজনের টান আর বিদায়ের বেদনা- সবমিলিয়ে ভাওয়াইয়া গান হয়ে উঠেছে কুড়িগ্রামের মানুষের আত্মার ভাষা।
ছবির মতো দৃশ্য- দুটি বলদ ধীরে টানছে গাড়ী, গাড়ীর উপর বসে আছে সাধারণ গ্রামীন মানুষ। মুখে নেই কোন তাড়া, চোখে নেই শহুরে ব্যস্ততা। আছে শুধু জীবনের সহজ সরলতা। এ যেন এক অন্য বাংলাদেশ- যেখানে সময় থেমে থাকে কিছুটা আর মানুষ বাঁচে প্রকৃতির ছন্দে।
গরুর গাড়ী ছিল শুধু যাতায়াতের মাধ্যম নয়, ছিল অনুভূতির বাহন। বিয়ের শোভাযাত্রা, ফসল আনা-নেওয়া কিংবা বাবার বাড়ি থেকে শ্বশুর বাড়ি যাওয়ার আবেগঘন মুহূর্ত-সবকিছুতেই গরুর গাড়ী ছিল অবিচ্ছেদ্য অংশ, আর সেই যাত্রাপথেই গেয়ে উঠতো গাড়ীয়াল, ভেসে আসতো ভাওয়াইয়ার সুর।
আজ আধুনিকতার ছোঁয়ায় গরুর গাড়ী হারিয়ে যেতে বসেছে। পিচ ঢালা রাস্তা, মোটরযান ও প্রযুক্তির দাপটে সেই ধীরগতির জীবন যেন বিলীন। তবুও গ্রামবাংলার কোথাও এখনও দেখা মেলে এ ঐতিহ্যের-যেন অতীতের এক জীবন্ত সাক্ষী।
কুড়িগ্রামের ভাওয়াইয়া আর গরুর গাড়ী আমাদের শিকড়ের গল্প বলে। বলে ভালোবাসার, বিচ্ছেদের আর সহজ জীবনের কথা। আধুনিকতার ভিড়ে এ সংস্কৃতিগুলোকে ধরে রাখা জরুরি-কারন এ গুলোই আমাদের সংস্কৃতির প্রান, আমাদের পরিচয়ের ভিত্তি।
হয়তো আজ আর প্রতিদিন শোনা যায় না সেই গান, দেখা যায় না সেই গাড়ী, গাড়ীয়ালদের। কিন্তু হৃদয়ের গভীরে এখনও বাজে "ধীরে বুলাও গাড়ীরে গাড়ীয়াল, আস্তে বুলাও গাড়ী, আরেক নজর দেখাইয়া নেও মুই দয়াল বাপের বাড়ি---।"