
হক আমীন:
একসময় গ্রামবাংলায় সন্ধ্যা মানেই ছিল অন্ধকার, আর সেই অন্ধকার ভেদ করে জ্বলে উঠতো ছোট্ট এক আলো-হারিকেন।
বিদ্যুতবিহীন গ্রামগুলোতে হারিকেন শুধু আলো দেওয়ার যন্ত্রই ছিল না, বরং ছিল জীবনযাত্রার এক অপরিহার্য অংশ, এক ধরনের আভিজাত্যের প্রতীক।
গ্রামের কাঁচাঘর, মাঠির উঠান কিংবা খড়ের চালার নিচে সন্ধ্যা নামলেই শুরু হত হারিকেন জ্বালানোর প্রস্ততি। মা, মেয়েরা যত্ন করে কাঁচ মুছতেন, শিশুরা আগ্রহ নিয়ে পাশে দাঁড়িয়ে দেখত। তারপর কেরোসিন ঢেলে, ফিতা ঠিক করে আগুন ধরানোর সঙ্গে সঙ্গে ঘর ভরে উঠতো এক ধরনের নরম হলুদ আলোয়।
সেই আলোতেই চলতো পড়ালেখা, গল্প-আড্ডা, এমনকি জীবনের ছোট ছোট আনন্দ-দু:খের ঘটনা ভাগাভাগি।
একসময় হারিকেন ছিল সামর্থ্যেরও প্রতীক। সব ঘরে হারিকেন থাকতো না। যে ঘরে থাকতো, তাকে গ্রামের লোকজন একটু ভিন্ন চোখেই দেখত। অনেকক্ষেত্রে একটি হারিকেন ঘিরেই বসত পুরো পরিবার। এর আলোয় যেমন আলোকিত হত ঘর, তেমনি আলোকিত হত মানুষের মন।
শুধু গৃহস্থালির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না হারিকেনের ব্যবহার। গ্রামীন সমাজজীবনে, হাটবাজারে, পথচলায়, এমনকি রাতের প্রহরীর হাতেও দেখা যেত আলোর এই সঙ্গীকে। আবার রাজনৈতিক অঙ্গনেও একসময় হারিকেনের উপস্থিতি ছিল লক্ষ্যণীয়। নির্বাচনী প্রতীক হিসেবে হারিকেন ছিল পরিচিত ও জনপ্রিয়। 'হারিকেন মার্কায় ভোট দিন' এমন শ্লোগান গ্রামগঞ্জকে মুখর করে তুলতো।
কিন্তু সময় বদলেছে। ঘরে ঘরে বিদ্যুতের বিস্তার, এলইডি বাতির সহজলভ্যতা-সবমিলিয়ে হারিকেন এখন বিলুপ্ত প্রায়। আধুনিক ঝলমলে আলোয় হারিকেনের মৃদু শিখা হারিয়ে গেছে।
তবুও হারিকেনের সেই নরম আলোয়, কেরোসিনের হালকা গন্ধ, পরিবারের এক সাথে বসার সেই মুহূর্তগুলো আজও অনেকের মনে গভীর দাগ কাটে। হারিকেন শুধু একটি যন্ত্র নয়, এটি গ্রামবাংলার সংস্কৃতি, ইতিহাস আর আবেগের এক উজ্জল বাহক।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী উম্মে আমারা। হারিকেনের কথা বলতেই, তিনি স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েন। বলেন "হারিকেনের আলোর সেই যুগ সত্যিই খুব মধুর ছিল। আনন্দয় ছিল। হারিকেনের আলোয় পড়ালেখার দিনগুলো এখনো স্মৃতিতে ভাসে।"
সময়ের স্রোতে হারিয়ে যাওয়া এই হারিকেন আমাদের স্মৃতির জাদুঘরে ঠাঁই নিয়েছে। প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক, কিছু স্মৃতি কখনোই মুছে ফেলা যায় না। সেই স্মৃতিগুলোই আমাদের শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত রাখে, মনে করিয়ে দেয় আমাদের অতীতের সরলতা আর সৌন্দর্যমাখা দিনগুলোর কথা।