
হক আমীন
বাংলার লোকসংস্কৃতির বর্ণিল ঐতিহ্যের এক অনন্য নাম বায়োস্কোপ। একসময় গ্রামবাংলার অলিগলি, হাট- বাজার কিংবা মেলার মাঠে শিশু কিশোরদের ভিড়ে মুখর থাকতো এ ছোট্ট বিনোদন মাধ্যমটি।
রঙিন ছবির ঘূর্ণায়মান বাক্সে চোখ রেখে মানুষ দেখত দূরের জগত, গল্প আর কল্পনার মেলবন্ধন। কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তির দাপটে আজ সেই বায়োস্কোপ প্রায় বিলুপ্তির পথে।
তবুও স্মৃতির সেই রঙিন জগত যেন আবার একটু প্রান ফিরে পেল পহেলা বৈশাখে রাজধানীর বিএএফ শাহীন কলেজ মাঠে। ১৪৩৩ নববর্ষের উত্সবমুখর পরিবেশে নানা লোকজ আয়োজনের ভিড়ে দেখা মিলল সেই হারিয়ে যেতে বসা বায়োস্কোপের।
শিশু-কিশোরদের কৌতুহলী চোখ, বয়স্কদের স্মৃতিকাতরতা-সবমিলিয়ে যেন ফিরে এলো পুরোনো দিনের একটুকরো ছবি। এ বায়োস্কোপের মালিক আলী রিয়াজ (৪০)। বাড়ি কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলায়। পেশায় তিনি একজন বায়োস্কোপ প্রদর্শক। জীবন যুদ্ধের কঠিন বাস্তবতায়ও তিনি ধরে রেখেছেন এ ঐতিহ্যবাহী বিনোদনকে।
ছোট্ট একটি কাঠের বাক্স, কিছু রঙিন ছবি, ঝুমুরের বাজনা আর ছন্দে ছন্দে নিজের কন্ঠের বর্ণনা আজও মানুষকে আনন্দ দেওয়ার চেষ্টা করেন।
আলী রিয়াজ বলেন," আগে গ্রাম গঞ্জের মেলায় বায়োস্কোপ দেখিয়ে ভালোই আয় হতো। এখন মোবাইল, টিভিতে সব দেখে, তাই আগের মতো চাহিদা নেই। তবুও বায়োস্কোপটি ছাড়তে পারি না আমার ভালোবাসার টানে।"
বায়োস্কোপ শুধু একটি বিনোদের মাধ্যম নয়, এটি আমাদের লোকসংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি গ্রামীন জীবনের সরল আনন্দ, সৃজনশীলতা এবং সামাজিক মিলনমেলার প্রতীক। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে এ ঐতিহ্য হারিয়ে যাচ্ছে, যা আমাদের লোকসংস্কৃতির জন্য এক বড় ক্ষতি।
পহেলা বৈশাখের মতো উত্সবে বায়োস্কোপের উপস্থিতি আমাদের মনে করিয়ে দেয়-প্রযুক্তির অগ্রগতির মাঝেও আমাদের শেকড় ভুলে গেলে চলবে না। দরকার সচেতনতা, যাতে ভবিষ্যত প্রজন্মও এ অনন্য লোকজ ঐতিহ্যের সাথে পরিচয় হতে পারে।
বায়োস্কোপের উদ্ভাবক জার্মান চলচিত্র শিল্পী জন ম্যাক্স। ১৮৯৫ সালে তিনি এটি তৈরি করেন। এটি মূলত একটি কাঠের বাক্সের ভেতর স্থির ছবির দেখার ব্যবস্থা।
বায়োস্কোপের সেই ছোট্ট ছিদ্র (লেন্স) দিয়ে দেখা রঙিন দুনিয়া আজও আমাদের হৃদয়ে জায়গা করে আছে। শুধু প্রয়োজন, তাকে বাঁচিয়ে রাখার আন্তরিকতা।