
হক আমীন
কুড়িগ্রাম জেলার ভৃরুঙগামারী উপজেলার থানা রোড ধরে বাজারের দিকে এগোলেই ডানা পাশে চোখে পড়ে একটি মটরসাইকেল গ্যারেজ। কোন সাইনবোর্ড নেই। তবুও সবাই এক নামে চেনে - জানে। এটি জাহিদুল মটরসাইকেল গ্যারেজ। দেওয়ালে ঝুলছে নানা যন্ত্রপাতি, চারপাশে তেলের গন্ধ - এই গ্যারেজই এখন দুই শিশুর জীবনসংগ্রামের মঞ্চ। তারা নাঈম (১৩) ও বায়জিদ (১১)। দুজনেই সনদবিহীন "ইঞ্জিনিয়ার।" তবে বাস্তবে তারা শিক্ষানবীশ শ্রমিক।
নাঈমের পিতা রফিকুল ইসলাম, আর বায়জিদের পিতা মাইদুল ইসলাম। তাদের বাড়ি উপজেলার পাইকেরছড়া গ্রামে। অভাব তাদের পরিবারের নিত্যসঙ্গী। সেই অভাবই কেড়ে নিয়েছে এই শিশুদুটির শৈশবের স্বাভাবিক ছন্দ, থামিয়ে দিয়েছে স্কুলে যাওয়ার পথ। বই - খাতা ছেড়ে এখন তাদের হাতে রেঞ্জ, স্ক্রুড্রাইভার।
গ্যারেজের প্রধান মিস্ত্রি সোহেলের কাছে শিখছে কাজ। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে পরিশ্রম। তেল মাখা হাত, ঘামে ভেজা শরীর - এই তাদের নিত্যদিনের বাস্তবতা। এখানে কোন বেতন নেই, বলা হয়েছে এক বছর পর হয়তো কিছু টাকা হাতে পাবে। ততদিন পর্যন্ত শুধু শেখা আর পরিশ্রমই তাদের ভরসা।
আইনের চোখে শিশু শ্রম নিষিদ্ধ । কাগজে কলমে শিশুদের জন্য রয়েছে শিক্ষা, খেলাধুলা আর সুন্দর ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন কথা বলে। যখন পেটের দায় সামনে দাঁড়ায়, তখন আইন যেন নীরব হ হয়ে যায়। দরিদ্র পরিবারের এই শিশুদের জন্য বেঁচে থাকাই বড় চ্যালেঞ্জ।
নাঈম ও বায়জিদের চোখে এখনো স্বপ্ন আছে। তারা চায় একদিন ভালো মিস্ত্রি হতে, নিজের গ্যারেজ খুলতে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায় - এই বয়সে তাদের হাতে বই না থেকে, কেন যন্ত্রপাতি?
সমাজের দায়িত্ব এখানেই - এই শিশুদের জন্য বিকল্প পথ তৈরি করা, যাতে তারা কাজ শিখতে পারে, পাশাপাশি শিক্ষার অধিকার থেকেও বঞ্চিত না হয়। তা না হলে এমন হাজারো নাঈম, বায়জিদের শৈশব হারিয়ে যাবে গ্যারেজের তেলের গন্ধে, আর স্বপ্নগুলো আটকে থাকবে অন্ধকার বাস্তবতায়।