
রুহুল আমিন, আএাই (নওগাঁ)
বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। এ দেশের অর্থনীতি, খাদ্যনিরাপত্তা এবং গ্রামীণ জীবনযাত্রার সঙ্গে কৃষি ও কৃষক অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। কৃষকের অক্লান্ত পরিশ্রমে ধান, গম, ভুট্টা, পাট, শাকসবজি, ফলমূলসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য উৎপাদিত হয়। কৃষকই দেশের মানুষের খাদ্য জোগান দেন এবং জাতীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয় হলো, যাদের শ্রমে দেশের খাদ্য উৎপাদিত হয়, সেই কৃষকেরাই অনেক সময় তাদের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন। তাই কৃষকের ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা বর্তমান সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দাবি।কৃষক দেশের অর্থনীতির প্রাণ। কৃষির মাধ্যমে শুধু খাদ্য উৎপাদনই নয়, বহু শিল্পকারখানার কাঁচামালও সরবরাহ করা হয়।
ন্যায্যমূল্য বলতে এমন মূল্যকে বোঝায়, যা কৃষকের উৎপাদন খরচ, শ্রম, সময় ও পরিশ্রমের যথাযথ মূল্যায়ন করে এবং তাকে একটি যুক্তিসংগত লাভের সুযোগ দেয়। ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হলে কৃষক তার পরিবারের চাহিদা পূরণ করতে পারেন এবং ভবিষ্যতে আরও ভালোভাবে কৃষিকাজে বিনিয়োগ করতে উৎসাহ পান।
বাংলাদেশের অনেক কৃষক ফসলের সঠিক দাম পান না। এর প্রধান কারণ হলো বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, মধ্যস্বত্বভোগীদের আধিপত্য, সংরক্ষণাগারের অভাব, পরিবহন সমস্যা এবং বাজারে দামের অস্থিরতা। অনেক সময় ফসল তোলার মৌসুমে বাজারে সরবরাহ বেশি থাকায় দাম কমে যায়। কৃষকের কাছে ফসল সংরক্ষণের সুযোগ না থাকায় তিনি বাধ্য হয়ে কম দামে বিক্রি করেন।বর্তমানে বীজ, সার, কীটনাশক, সেচ, জ্বালানি, শ্রমিকের মজুরি এবং পরিবহন খরচ আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। কিন্তু সেই অনুপাতে ফসলের বাজারমূল্য বৃদ্ধি পায় না। ফলে কৃষক উৎপাদন খরচও তুলতে পারেন না। অনেক কৃষক ঋণ নিয়ে চাষাবাদ করেন এবং ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় ঋণের বোঝায় জর্জরিত হয়ে পড়েন।
কৃষকের ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সরকার ও সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। সরকারকে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ফসল কেনার ব্যবস্থা বাড়াতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ কৃষিপণ্যের ন্যূনতম সহায়ক মূল্য নির্ধারণ করতে হবে। গ্রামে গ্রামে আধুনিক হিমাগার ও সংরক্ষণাগার নির্মাণ করতে হবে, যাতে কৃষক প্রয়োজনে কিছুদিন ফসল সংরক্ষণ করে ভালো দামে বিক্রি করতে পারেন।এছাড়া বাজারে নিয়মিত তদারকি, মধ্যস্বত্বভোগীদের নিয়ন্ত্রণ, কৃষকদের সহজ শর্তে ঋণ প্রদান, উন্নতমানের বীজ ও সার সরবরাহ এবং কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো প্রয়োজন। অনলাইন বাজারব্যবস্থা ও কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ভোক্তার কাছে কৃষিপণ্য পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগও নেওয়া যেতে পারে। কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হলে কৃষকের জীবনমান উন্নত হবে। তারা আরও উৎসাহের সঙ্গে কৃষিকাজ করবেন এবং কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। দেশের খাদ্যনিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হবে। কৃষকের আয় বাড়লে গ্রামীণ অর্থনীতি সচল হবে, দারিদ্র্য কমবে এবং জাতীয় অর্থনীতি আরও সমৃদ্ধ হবে।
কৃষক দেশের খাদ্য উৎপাদনের মূল কারিগর। তাদের পরিশ্রমের ফলেই দেশের মানুষ নিরাপদে জীবনযাপন করতে পারে। তাই কৃষকের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা শুধু মানবিক দায়িত্ব নয়, এটি দেশের উন্নয়নেরও পূর্বশর্ত। কৃষকের ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সরকার, ব্যবসায়ী, গণমাধ্যম এবং সাধারণ জনগণকে একযোগে কাজ করতে হবে। কৃষক বাঁচলে কৃষি বাঁচবে, কৃষি বাঁচলে দেশ এগিয়ে যাবে। তাই কৃষকের ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করাই হোক আমাদের সবার অঙ্গীকার।