
রুহুল আমিন, আএাই (নওগাঁ)
বাংলাদেশ একটি নদীমাতৃক এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ দেশ। প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে অতিবৃষ্টি, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল এবং নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যা দেখা দেয়। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বন্যার তীব্রতা ও স্থায়িত্ব আরও বেড়েছে। বন্যা শুধু মানুষের ঘরবাড়ি, ফসল ও সম্পদের ক্ষতিই করে না, বরং মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অর্থনীতির ওপরও গভীর প্রভাব ফেলে। এই দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে শিশু অন্যতম। তারা শারীরিকভাবে দুর্বল, মানসিকভাবে সংবেদনশীল এবং বিপদ সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা না থাকায় সহজেই দুর্ঘটনার শিকার হতে পারে। তাই বন্যার সময় শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রতিটি পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
বন্যার সময় শিশুদের নানা ধরনের ঝুঁকির মুখোমুখি হতে হয়। অনেক সময় তারা বন্যার পানিতে খেলতে গিয়ে ডুবে যায় অথবা তীব্র স্রোতে ভেসে যায়। পানির নিচে গর্ত, খোলা ড্রেন, ভাঙা রাস্তা বা বিদ্যুতের তার থাকতে পারে, যা শিশুদের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক।
এছাড়া দূষিত পানি ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের কারণে ডায়রিয়া, কলেরা, টাইফয়েড, হেপাটাইটিস, চর্মরোগ এবং শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণের মতো রোগ ছড়িয়ে পড়ে। মশার বংশবৃদ্ধি বেড়ে যাওয়ায় ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়ার ঝুঁকিও বৃদ্ধি পায়। অনেক পরিবার খাদ্যসংকটে পড়ে, ফলে শিশুদের অপুষ্টি ও পানিশূন্যতার সমস্যা দেখা দেয়।
বন্যার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব হলো মানসিক চাপ। ঘরবাড়ি হারানো, প্রিয় জিনিস নষ্ট হয়ে যাওয়া, স্কুল বন্ধ থাকা এবং স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হওয়ার কারণে শিশুরা ভয়, উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তায় ভোগে। এসব বিষয় তাদের মানসিক বিকাশেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বন্যা শুরু হওয়ার আগেই শিশুদের নিরাপত্তার জন্য প্রস্তুতি নেওয়া উচিত। পরিবারে একটি জরুরি পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে, যাতে সবাই জানে প্রয়োজনে কোথায় আশ্রয় নিতে হবে এবং কীভাবে নিরাপদ স্থানে পৌঁছাতে হবে।
একটি জরুরি ব্যাগ প্রস্তুত রাখতে হবে। এতে শিশুর জন্য প্রয়োজনীয় শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানীয় পানি, দুধ, ওষুধ, কাপড়, কম্বল, টর্চলাইট, অতিরিক্ত ব্যাটারি, প্রাথমিক চিকিৎসার বাক্স, স্যানিটারি সামগ্রী এবং গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র জলরোধী ব্যাগে সংরক্ষণ করতে হবে।
শিশুদের সহজ ভাষায় বন্যার ঝুঁকি সম্পর্কে জানাতে হবে এবং শেখাতে হবে যে বন্যার পানিতে নামা বা একা বাইরে যাওয়া বিপজ্জনক। এতে তারা দুর্যোগের সময় আরও সচেতন থাকবে।
বন্যার সময় শিশুদের নিরাপদ রাখার উপায়
বন্যার সময় শিশুদের সবসময় একজন প্রাপ্তবয়স্কের তত্ত্বাবধানে রাখতে হবে। তাদের কখনো একা বাইরে যেতে দেওয়া যাবে না। বন্যার পানিতে খেলতে দেওয়া উচিত নয়, কারণ পানির নিচে কী রয়েছে তা বোঝা যায় না।
শিশুদের জন্য সবসময় বিশুদ্ধ পানীয় পানি নিশ্চিত করতে হবে। পানি ফুটিয়ে অথবা বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট ব্যবহার করে পান করানো উচিত। শিশুদের পুষ্টিকর ও নিরাপদ খাবার খাওয়াতে হবে। বাসি, পচা বা দূষিত খাবার সম্পূর্ণভাবে পরিহার করতে হবে।
স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। খাওয়ার আগে ও টয়লেট ব্যবহারের পরে সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার অভ্যাস বজায় রাখতে হবে। শিশুদের পরিষ্কার ও শুকনো কাপড় পরাতে হবে এবং ভেজা কাপড় দ্রুত পরিবর্তন করতে হবে।
মশার উপদ্রব থেকে রক্ষা পেতে মশারি ব্যবহার করতে হবে এবং আশপাশ পরিষ্কার রাখতে হবে। কোনো শিশু অসুস্থ হলে দেরি না করে নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যেতে হবে।
যদি বাড়িতে থাকা নিরাপদ না হয়, তবে দ্রুত সরকারি বা নির্ধারিত আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যেতে হবে। আশ্রয়কেন্দ্রে শিশুদের পরিবারের কাছাকাছি রাখতে হবে, যাতে তারা হারিয়ে না যায়।
সেখানে পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানি, পুষ্টিকর খাবার, নিরাপদ শৌচাগার এবং স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। ছোট শিশুদের জন্য আলাদা নিরাপদ স্থান থাকলে তাদের দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমে যায়।
বন্যার সময় শিশুরা মানসিকভাবে ভয় ও উদ্বেগে ভুগতে পারে। তাই তাদের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলতে হবে, সাহস দিতে হবে এবং বোঝাতে হবে যে পরিস্থিতি একসময় স্বাভাবিক হয়ে যাবে। তাদের একাকী থাকতে না দিয়ে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটাতে উৎসাহিত করতে হবে।
শিশুদের গল্প শোনানো, ছবি আঁকা, বই পড়া বা ছোটখাটো খেলাধুলার ব্যবস্থা করলে তারা মানসিকভাবে কিছুটা স্বস্তি পায়। প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।
পরিবার, সমাজ ও সরকারের ভূমিকা
শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু পরিবারের সচেতনতা যথেষ্ট নয়। স্থানীয় প্রশাসন, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, স্বাস্থ্যকর্মী এবং সমাজের সচেতন মানুষেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
সরকারের উচিত বন্যাপ্রবণ এলাকায় আগাম সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়া, পর্যাপ্ত আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা, বিশুদ্ধ পানি ও খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং শিশুদের জন্য বিশেষ স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা করা। বিভিন্ন সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন শিশুদের জন্য খাদ্য, ওষুধ, পোশাক এবং শিক্ষা উপকরণ বিতরণ করে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
বন্যার সময় সচেতনতাই সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা। পরিবারে সবাই যদি শিশুদের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ করে এবং সরকারি নির্দেশনা মেনে চলে, তাহলে অনেক দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব। স্কুল, গণমাধ্যম এবং সামাজিক সংগঠনগুলোর মাধ্যমে শিশু ও অভিভাবকদের নিয়মিত দুর্যোগ প্রস্তুতি সম্পর্কে প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা বৃদ্ধি করা উচিত।
শিশুরা একটি দেশের ভবিষ্যৎ সম্পদ। তাদের নিরাপত্তা ও সুস্থতা নিশ্চিত করা প্রতিটি নাগরিকের নৈতিক, সামাজিক ও মানবিক দায়িত্ব। বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে সামান্য অসতর্কতাও বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। তাই আগাম প্রস্তুতি গ্রহণ, বিশুদ্ধ পানি ও নিরাপদ খাদ্যের ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা, মানসিক সহায়তা প্রদান এবং সময়মতো নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার মাধ্যমে শিশুদের জীবন ও স্বাস্থ্য রক্ষা করা সম্ভব। আসুন, আমরা সবাই সচেতন হই এবং বন্যার সময় প্রতিটি শিশুর নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে একটি নিরাপদ, মানবিক ও দুর্যোগ-সহনশীল সমাজ গড়ে তুলি।গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
সরকারের উচিত বন্যাপ্রবণ এলাকায় আগাম সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়া, পর্যাপ্ত আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা, বিশুদ্ধ পানি ও খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং শিশুদের জন্য বিশেষ স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা করা। বিভিন্ন সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন শিশুদের জন্য খাদ্য, ওষুধ, পোশাক এবং শিক্ষা উপকরণ বিতরণ করে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।