
নাজমূল হকঃ
গ্রামবাংলার চিরচেনা ঐতিহ্যের সঙ্গে মিশে আছে নদী, নৌকা আর নৌকা বাইচ। বর্ষার পানিতে নদী যখন টইটম্বুর, তখনই যেন প্রান ফিরে পায় বাংলার এই লোকজ উত্সব । বৈঠার ছন্দ, মাঝিদের হুঙ্কার আর হাজারো দর্শকের উচ্ছাসে নদীর বুক হয়ে উঠে উৎসবমুখর। হাজার বছরের এই ঐতিহ্য আজও আমাদের সংস্কৃতি ও শিকড়ের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে পরম মমতায়।
এই ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার জগতলা, যমুনা নদীতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে "ডাক্তার এম এ মতিন স্মৃতি" জমজমাট নৌকা বাইচ। গত ২৪ আগস্ট থেকে চলছে এই বাইচ চলবে সপ্তাহব্যাপী। নৌকা বাইচকে ঘিরে যমুনা নদীর তীরে সৃষ্টি হয়েছে উৎসবের আমেজ । দূর- বহুদূর থেকে আসা হাজারো দর্শকের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে যমুনার তীর।
এই নৌকা বাইচচে অংশ নিচ্ছে পাবনার সাথিয়া, সুজানগর, সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া, শাহজাদপুর উপজেলার দলটি নৌকা। নৌকাগুলো হল- আল- মদিনা এক্সপ্রেস, বিজয় নিশান, একতা এক্সপ্রেস, পদ্মা এক্সপ্রেস, নিউ উড়ন্ত বলাকা, বরজবালা, পাঁচ তাঁরা এক্সপ্রেস, গোনাইগাতী দুরন্ত এক্সপ্রেস ও রাই শিমুল একতা এক্সপ্রেসসহ দশটি। প্রতিটি নৌকায় একদল দক্ষ মাঝি প্রতিযোগিতার টান পড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাইছালদের ছন্দময় বৈঠার আঘাতে নদীর পানি যেন ঢেউ তুলে ছুটতে থাকে। কোন নৌকা আগে পৌছাবে গন্তব্যে- এই উত্তেজনায় দর্শকরাও মুহুর্তে মেতে উঠছে আনন্দ উল্লাসে । নদীর তীরে ভেসে আসছে মুহুর্মুহু করতালি, হর্ষধনি আর উতসাহের আওয়াজ ।
এই নৌকা বাইচ কেবল একটি প্রতিযোগিতা নয়, গ্রামীন মানুষের কাছে এটি মিলনমেলারও উপলক্ষ। শিশু- কিশোর থেকে শুরু করে তরুন- প্রবীন সব বয়সী মানুষ এই উতসবে শামিল হচ্ছে।
নৌকা বাইচের সঙ্গে মিশে আছে নদী আমাদের নদীমাতৃক বাংলাদেশের ইতিহাস ও জীবনযাত্রা। একসময় নদীই ছিল প্রধান মাধ্যম। নৌকাই ছিল মানুষের চলাচলের অন্যতম ভরসা। সেই নদী কেন্দ্রিক জীবন থেকেই জন্ম নিয়েছে নৌকা বাইচের মতো লোকজ সংস্কৃতি। সময়ের পরিবর্তনে জীবনের অনেক কিছু বদলে গেলেও এই ঐতিহ্য মানুষের মনে এখনও জায়গা করে রেখেছে।
তবে আধুনিকতার বিস্তারে গ্রামবাংলার অনেক লোকজ ঐতিহ্য আজ হারিয়ে যাওয়ার পথে। এমন বাস্তবতায় শাহজাদপুর জগতলার নৌকা বাইচের আয়োজন শুধু বিনোদন নয়, এটি আমাদের সাংস্কৃতিক শিকড়কে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরারও একটি প্রয়াস।
যমুনার ঢেউয়ের সঙ্গে ছুটে চলা দশটি নৌকা যেন বহন করছে গ্রামবাংলার হাজার বছরের স্মৃতি। বৈঠার প্রতিটি আঘাতে উচ্চারিত হয় গ্রামবাংলার প্রানের কথা। পানশি নৌকাগুলো যেন প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম বয়ে নিয়ে যায় বাংলার মাটি, মানুষ ও নদীর গল্প।