
মতিউর রহমান মিঠু
পৃথিবীর প্রায় তিন ভাগ জল আর এক ভাগ স্থল। অথচ নিরাপদ ও ব্যবহারযোগ্য পানির সংকট আজ বিশ্বের বহু দেশের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ। আমাদের দেশেও এর বাইরে নয়। বিশেষ করে দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বরেন্দ্র অঞ্চলের পানি সংকট এখন আর ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়; এটি বাস্তবে রুপ নিয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এই সংকট মোকাবিলায় আমরা কতটা প্রস্তুত?
বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, জয়পুরহাট, বগুড়া, রংপুর ও দিনাজপুরসহ বিভিন্ন জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা বরেন্দ্র অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত। একইভাবে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, কুষ্টিয়া, যশোর, মাগুরা ও ঝিনাইদহের কিছু এলাকাতেও ভূগর্ভস্থ পানির প্রাপ্যতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। তবে বরেন্দ্র অঞ্চলের পানি সংকটের ধরন ও তীব্রতা বিশেষভাবে লক্ষনীয় এবং এই বিষয়ে নীতি নির্ধারণী আলোচনার দাবি রাখে।
নওগাঁ জেলার পোরশা, নিয়ামতপুর, সাপাহার ও পত্নীতলা উপজেলাসহ বিভিন্ন এলাকায় পানির সংকট কৃষি ও জন জীবনে মারাত্বক প্রভাব ফেলছে।এসব এলাকায় বৃষ্টিপাতের অনিয়ম, দীর্ঘ শুষ্ক মৌসুম, ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত ব্যবহার এবং পানির প্রাকৃতিক পুনর্ভরণের সীমাবদ্ধতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।ফলে কাজ হারিয়ে হাজার হাজার মানুষ দেশান্তরী হয়েছে।কৃষি বাস্তু তন্ত্র ধ্বংস প্রাপ্ত হয়েছে।
পানি সংকটের কারণ কি শুধু বৃষ্টির অভাব?
বরেন্দ্র অঞ্চলের পানি সংকটের কারণ অনুসন্ধান করলে কয়েকটি বিষয় সামনে আসে-
(ক)বৃষ্টিপাতের স্বাভাবিক ধারায় পরিবর্তন এবং দীর্ঘ শুষ্ক মৌসুম পানির সংকট বাড়িয়ে দিচ্ছে। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় বর্ষাকালে পাওয়া পানির একটি বড় অংশ ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে শুষ্ক মৌসুমে কৃষি ও দৈনন্দিন কাজে পানির চাহিদা মেটাতে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে।
(খ)ভূগর্ভস্থ পানির প্রাকৃতিক পুনর্ভরণ সব এলাকায় একই হারে ঘটে না। মাটির গঠন, ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য, বৃষ্টির পানি মাটিতে প্রবেশের সুযোগ এবং স্থানীয় জলাভূমির অবস্থার ওপর পানির পুনর্ভরণ নির্ভর করে। কোথাও বৃষ্টির পানি ভূগর্ভে পৌঁছানোর সুযোগ সীমিত, আবার কোথাও অতিরিক্ত পানি উত্তোলনের কারণে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে।
(গ)কৃষিতে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিনির্ভরতা পরিস্থিতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। বিশেষ করে বোরো ধানের চাষে শুষ্ক মৌসুমে বিপুল পরিমাণ পানির প্রয়োজন হয়। এই চাহিদা মেটাতে নির্বিচারে গভীর ও অগভীর নলকূপের ব্যবহার বাড়লে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক।
কৃষি আমাদের অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তার অন্যতম ভিত্তি। তাই কৃষির জন্য পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। কিন্তু সেই পানি যদি এমনভাবে ব্যবহার করা হয়, যাতে ভবিষ্যতে মানুষের পান করার পানিই সংকটের মুখে পড়ে, তাহলে আমাদের উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে নতুন করে ভাবার দরকার আছে।
আন্তর্জাতিক নদীর পানি: ভাটির দেশের বাস্তবতা-
বাংলাদেশের পানি সংকট নিয়ে আলোচনা করতে গেলে আন্তর্জাতিক নদীর পানি প্রবাহের বিষয়টি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। বাংলাদেশ একটি ভাটির দেশ। দেশের অসংখ্য নদী, উপনদী, খাল-বিল ও জলাভূমি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে উজান থেকে আসা পানির সঙ্গে সম্পর্কিত।
আন্তর্জাতিক নদীর পানিবণ্টন, উজানে পানি প্রত্যাহার, বাঁধ ও অন্যান্য অবকাঠামোর প্রভাব নিয়ে এ দেশের প্রকৃতি সচেতন মানুষদের দীর্ঘদিনের উদ্বেগ রয়েছে।এদেশের নানা পরিবেশবাদী সংগঠন এবং বাম ও জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক গুলো উজান দেশের অনায্য পানি প্রত্যাহারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে আসছে। শুষ্ক মৌসুমে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ কমে গেলে তার প্রভাব শুধু নদীর ওপর পড়ে না; ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ, কৃষি, মৎস্যসম্পদ, নৌপরিবহন এবং নদী কেন্দ্রিক জীববৈচিত্র্যও ক্ষতিগ্রস্ত হয়, নদীর বাস্তুতন্ত্র ধ্বংস হয়।
তবে মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশের পানি সংকটের সব দায় শুধু উজানের দেশের উপর চাপিয়ে দিলে সমস্যার পূর্ণাঙ্গ সমাধান পাওয়া যাবে না। আন্তর্জাতিক নদীর ন্যায্য পানিবণ্টনের জন্য কার্যকর কূটনীতি ও আঞ্চলিক সহযোগিতা যেমন প্রয়োজন, তেমনি দেশের ভেতরে পানির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, নদী-খাল পুনরুদ্ধার এবং বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের আয়োজন করা অত্যান্ত জরুরি। উজানের পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ের দাবি থাকবে। একই সঙ্গে নিজেদের হাতে থাকা পানিসম্পদ আমরা কীভাবে ব্যবহার করছি, সেই প্রশ্নেরও জবাব দিতে হবে।
নদী-খাল-বিল হারিয়ে গেলে পানি পাবো কোথা থেকে?
আমাদের দেশে একসময় গ্রামাঞ্চলের অসংখ্য পুকুর, ডোবা, খাল-বিল ও সরকারি জলাশয় মানুষের দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। এসব জলাশয়ের পানি গৃহস্থালির বিভিন্ন কাজে ব্যবহৃত হতো। অনেক ক্ষেত্রে শুষ্ক মৌসুমে কৃষি কাজেও এই পানি কাজে লাগত। জলাশয় গুলো মাছের প্রজনন, জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং স্থানীয় পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখত।কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক জলাশয় ভরাট হয়েছে, দখল হয়েছে কিংবা নানা কারণে পানি ধারণের সক্ষমতা হারিয়েছে। কোথাও সরকারি পুকুর-জলাশয় ভরাট করে স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে, কোথাও খাল সংকুচিত হয়েছে, আবার কোথাও জলাশয়ের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, এসব জলাশয় হারিয়ে যাওয়ার দায় কার?
অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি, রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় পরিচালিত দখলদার চক্র এবং প্রশাসনিক নজরদারির দুর্বলতার অভিযোগ সামনে আসে। সরকারি জলাশয় ইজারা দেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে। কিন্তু ইজারা দেওয়ার উদ্দেশ্য যদি জনস্বার্থ রক্ষা, জলাশয়ের সংরক্ষণ ও টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়, তাহলে সেই ব্যবস্থাকে স্বাগত জানানো যায়। বিপরীতে, ইজারার নামে জলাশয়ের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বন্ধ করা, পানি দূষিত করা কিংবা জনসাধারণের ব্যবহার সীমিত করে দেওয়া হলে তা অবশ্যই প্রশ্নের মুখে পড়বে।মাছ চাষের জন্য জলাশয় ইজারা দেওয়া নিজে কোনো সমস্যা নয়। সমস্যা তখনই, যখন ইজারার শর্ত মানা হয় না, জলাশয়ের পানি ব্যবস্থাপনায় জনস্বার্থ উপেক্ষিত হয় এবং সরকারি সম্পদ ব্যবহারের ক্ষেত্রে জবাবদিহি থাকে না।আমরা যদি জলাশয়কে কেবল ইজারা থেকে রাজস্ব আয়ের উৎস হিসেবে দেখি, তাহলে এর পরিবেশগত ও সামাজিক গুরুত্ব উপেক্ষিত হবে। একটি জলাশয়ের মূল্য শুধু সেখানে কত টাকার মাছ উৎপাদিত হলো, তা দিয়ে নির্ধারণ করা যায় না। শুষ্ক মৌসুমে কৃষক, স্থানীয় মানুষ, মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর জন্য সেই জলাশয়ের গুরুত্বও বিবেচনায় নিতে হবে।
রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া জলাশয় রক্ষা সম্ভব?
বাংলাদেশে নদী, খাল, বিল ও সরকারি জলাশয় রক্ষায় আইন ও নীতিমালা রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে জলাশয় পুনরুদ্ধার, খনন ও সংরক্ষণের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অনেক ক্ষেত্রে এসব উদ্যোগের ধারাবাহিকতা থাকে না। কোথাও খনন করা খাল কয়েক বছরের মধ্যে আবার ভরাট হয়ে যায়, কোথাও জলাশয় দখলমুক্ত করার পর পুনরায় দখলের ঘটনা ঘটে।এর পেছনে স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের ভূমিকা, রাজনৈতিক প্রশ্রয়, দুর্বল তদারকি এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান গুলোর সমন্বয়হীনতা। এসব সমস্যা মোকাবিলায় শুধু প্রকল্প গ্রহণ করলেই হবে না; প্রকল্পের অর্থ ব্যয়, কাজের মান, রক্ষণাবেক্ষণ এবং দখলমুক্ত অবস্থার স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে হবে।সরকারি জলাশয় জনগণের সম্পদ। কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী কিংবা রাজনৈতিক দলের সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য এই সম্পদের ব্যবহার করা হলে তার মূল্য দিতে হয় পুরো সমাজকে। পানিসংকটের সময় সেই মূল্য আরও বেশি করে অনুভূত হয়।
তাহলে আমাদের করণীয় কী?
(১)বরেন্দ্র অঞ্চলের পানিসংকট মোকাবিলায় প্রথমেই প্রয়োজন এলাকাভিত্তিকপানিসম্পদের সঠিক হিসাব। কোথায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর কতটা নিচে নামছে, কোথায় কী পরিমাণ পানি উত্তোলন হচ্ছে, কোথায় বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের সুযোগ রয়েছে এবং কোন এলাকায় বিকল্প পানির উৎস তৈরি করা সম্ভবএসব বিষয়ে নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ করতে হবে।
(২)বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, পুকুর ও জলাশয় পুনরুদ্ধার, খাল পুনঃখনন এবং প্রাকৃতিক পানিপ্রবাহ সচল রাখার উদ্যোগ নিতে হবে। তবে খনন বা পুনরুদ্ধারের আগে সংশ্লিষ্ট এলাকার ভূপ্রকৃতি, পানিপ্রবাহ এবং পরিবেশগত বাস্তবতা বিবেচনা করা জরুরি।
(৩)কৃষিতে পানিব্যবহারে দক্ষতা বাড়াতে হবে।পানি সংকটপূর্ণ এলাকায় কম পানি নির্ভর ফসল, সেচের উন্নত পদ্ধতি এবং স্থানীয় পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য পূর্ণ কৃষি ব্যবস্থা উৎসাহিত করতে হবে। তবে কৃষকের উপর এক তরফা ভাবে ফসল পরিবর্তনের চাপ না দিয়ে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, প্রণোদনা ও বাজার সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।
(৪)সরকারি জলাশয় দখল, অবৈধ ভরাট এবং দূষণ বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। জলাশয় ইজারা দেওয়ার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, পরিবেশগত শর্ত এবং জনসাধারণের স্বার্থ নিশ্চিত করতে হবে। কোথাও অনিয়মের অভিযোগ থাকলে নিরপেক্ষ তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
(৫)আন্তর্জাতিক নদীর পানিবণ্টন নিয়ে বাংলাদেশের ন্যায্য দাবিকে আরও কার্যকরভাবে এগিয়ে নিতে হবে। একই সঙ্গে আন্তঃসীমান্ত নদীর যৌথ ব্যবস্থাপনা, তথ্য বিনিময় এবং শুষ্ক মৌসুমে পানিপ্রবাহ বজায় রাখার বিষয়ে আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়াতে হবে।
সংকট আসার অপেক্ষায় থাকব, নাকি প্রস্তুতি নেব?
পানির সংকট এক দিনে তৈরি হয়নি। দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, প্রাকৃতিক পরিবর্তন, অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন, জলাশয় হারিয়ে যাওয়া এবং আন্তর্জাতিক নদীর পানিপ্রবাহ নিয়ে অনিশ্চয়তাসব মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল হয়েছে।আমরা উন্নয়নের কথা বলি, কৃষি উৎপাদনবাড়ানোর কথা বলি, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার কথা বলি। কিন্তু যে পানির ওপর এসব অর্জন নির্ভরশীল, সেই পানির উৎসগুলোই যদি ক্রমাগত সংকুচিত হতে থাকে, তাহলে এই উন্নয়ন কতটা টেকসই হবে?
বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষককে প্রতি বছর সেচের পানির জন্য আরও গভীরে যেতে হলে, গ্রামের মানুষকে পানির জন্য দূরে যেতে হলে এবং সরকারি জলাশয় জনগণের প্রয়োজন মেটানোর বদলে দখল ও অনিয়মের শিকার হলে আমাদের উন্নয়ন পরিকল্পনার সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।প্রকৃতি আমাদের পানির উৎস দিয়েছে, কিন্তু সেই পানি অনন্তকাল ধরে অবাধে ব্যবহার করার অধিকার দেয়নি। ভূগর্ভস্থ পানিরও সীমা আছে, নদীরও স্বাভাবিক প্রবাহ প্রয়োজন, জলাশয়েরও নিজস্ব পরিবেশগত ভূমিকা রয়েছে।তাই এখনই সময় পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনাকে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং জনসম্পৃক্ততার আওতায় আনার। পানি সংরক্ষণকে বিচ্ছিন্ন কোনো প্রকল্প হিসেবে না দেখে জাতীয় পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
আমাদের সামনে প্রশ্ন একটাই, এইসংকট আরও গভীর হওয়ার পর ব্যবস্থা নেব, নাকি এখনই নিজেদের পানিসম্পদ রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ নেব?