
লেখা: নাহিদ ইসলাম
বয়স ৬০ পেরিয়েছে অনেক আগেই। জীবনের নানা ব্যস্ততা আর দায়িত্বের ভারে মাঠের খেলাধুলা থেকে দূরে সরে গেছেন তাঁরা। কেউ কখনো ফুটবল খেলোয়াড় ছিলেন না। তবু ফুটবলের প্রতি ভালো লাগা আর শৈশবের স্মৃতি তো আর বয়স মানে না। তাই তরুণদের আমন্ত্রণে আবারও ফুটবল নিয়ে মাঠে নামলেন নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলার গোবিন্দপুর গ্রামের প্রবীণেরা। তাঁদের কারও বয়স ৬০, কারও তারও বেশি।
গতকাল মঙ্গলবার গোবিন্দপুর স্পোর্টিং ক্লাবের উদ্যোগে আয়োজন করা হয় এক দিনের ব্যতিক্রমী প্রীতি ফুটবল টুর্নামেন্ট। এতে অংশ নেন গ্রামের ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী ব্যক্তিরা। তাঁদের মধ্যে ছিলেন জব্বার, মান্নানসহ স্থানীয় কয়েকজন প্রবীণ।

মাঠে তখন বয়সের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছিল আনন্দ আর অংশ নেওয়ার উচ্ছ্বাস। বলের পেছনে ছোটা, সতীর্থদের সঙ্গে বোঝাপড়া আর গোলের চেষ্টা—সব মিলিয়ে এক বিকেলের জন্য যেন বদলে গিয়েছিল চেনা জীবনের ছন্দ। দর্শকসংখ্যা খুব বেশি না হলেও মাঠজুড়ে ছিল হাসি-আনন্দ আর কৌতূহল। প্রবীণদের খেলতে দেখে উৎসাহ দিচ্ছিলেন স্থানীয় তরুণেরাও।
নির্ধারিত সময়ের খেলা গোলশূন্য ড্র হয়। পরে টাইব্রেকারে নির্ধারিত হয় বিজয়ী দল। খেলা শেষে দুই দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে প্রতীকী পুরস্কারের অর্থ ভাগ করে দেওয়া হয়। জয়-পরাজয়ের হিসাব ছাপিয়ে প্রবীণদের মাঠে নামার আনন্দই হয়ে ওঠে আয়োজনের মূল আকর্ষণ।
আয়োজক আল-মামুন (২৬) বলেন, ‘আমরা সাধারণত তরুণদের নিয়ে বিভিন্ন খেলাধুলার আয়োজন দেখি। কিন্তু প্রবীণদের নিয়ে এমন আয়োজন সচরাচর হয় না। তাঁদের মুখে হাসি ফোটানো এবং এক দিনের জন্য হলেও শৈশবের স্মৃতি ফিরিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যেই আমাদের এই উদ্যোগ। ভবিষ্যতেও এমন ব্যতিক্রমী আয়োজন অব্যাহত রাখতে চাই।’
খেলায় অংশ নেওয়া ৬০ ঊর্ধ্ব জব্বারের চোখেমুখেও ছিল আনন্দের ছাপ। তিনি বলেন, ‘এই বয়সে এসে আবার ফুটবল খেলব, তা কখনো ভাবিনি। ছোটবেলায় খেলাধুলার অনেক স্মৃতি থাকলেও খেলোয়াড় হওয়ার সুযোগ হয়নি। আজ মাঠে নেমে খুব আনন্দ পেয়েছি। মনে হয়েছে, আবার যেন ছোটবেলায় ফিরে গেছি।’
খেলা দেখতে আসা তরুণ সিহাবের (২১) কাছেও আয়োজনটি ছিল অন্য রকম অভিজ্ঞতা। তিনি বলেন, ‘আমরা সাধারণত তরুণদের ফুটবল খেলতে দেখি। কিন্তু নিজেদের গ্রামের বয়স্ক মানুষদের এভাবে মাঠে খেলতে দেখা সত্যিই অন্য রকম অনুভূতি। তাঁদের আনন্দ দেখে আমাদেরও খুব ভালো লেগেছে। এমন আয়োজন নিয়মিত হলে গ্রামের সবাই আনন্দ পাবে।’
খেলায় সভাপতিত্ব করেন ৭০ বছর বয়সী আব্দুল হামিদ। প্রবীণদের নিয়ে এমন উদ্যোগের প্রশংসা করে তিনি বলেন, ‘বয়স মানুষের শরীরে বাড়ে, কিন্তু আনন্দ করার ইচ্ছা কখনো শেষ হয় না। তরুণেরা আমাদের কথা চিন্তা করে এমন একটি আয়োজন করেছে, এতে আমরা আনন্দিত। সমাজে তরুণ ও প্রবীণদের মধ্যে এমন আন্তরিক সম্পর্ক বজায় থাকুক—এটাই প্রত্যাশা।’
তরুণদের উদ্দেশে তাঁর পরামর্শ, মোবাইল ফোনের অপব্যবহার ও মাদক থেকে দূরে থেকে খেলাধুলা এবং শারীরিক পরিশ্রমে সময় দেওয়া উচিত। অবসর সময়ের অন্তত বিকেলটা মাঠে কাটালে শরীর ও মন দুটোই ভালো থাকবে বলে মনে করেন তিনি।
নিয়ামতপুরের প্রত্যন্ত গ্রাম গোবিন্দপুর যোগাযোগব্যবস্থার দুর্ভোগসহ নানা সমস্যার কারণে বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় এসেছে। এবার সেই গ্রামের আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে প্রবীণদের ফুটবল। তরুণদের এই উদ্যোগে একদিকে যেমন প্রবীণেরা ফিরে পেয়েছেন হারানো দিনের আনন্দ, অন্যদিকে তৈরি হয়েছে প্রজন্মের মধ্যে সম্প্রীতি ও আন্তরিকতার এক সুন্দর উপলক্ষ। এক বিকেলের এই আয়োজন মনে করিয়ে দিয়েছে, আনন্দ উপভোগের জন্য বয়স কোনো বাধা নয়।